শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর জড়তা দূরীকরণে ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’

ফয়সল আহমদ বাবুল

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা মানুষের চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। এটি শুধু তথ্য জানার প্রক্রিয়া নয়। শিক্ষা মানুষকে বুঝতে শেখায়, ভাবতে শেখায় এবং প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেয়। বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করার দক্ষতা গড়ে তোলে। ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা তৈরি করে। মানুষ নতুন বিষয় সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে। ফলে অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় তাই মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বের হয়ে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে এমন শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থী কেবল নিষ্ক্রিয় শ্রোতা হয়ে বসে থাকবে না, বরং নিজেই চিন্তা করবে, আলোচনা করবে এবং জ্ঞান নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ ঠিক এমনই একটি কার্যকর ও আধুনিক শিক্ষণ-কৌশল। এই কৌশলটি ১৯৮১ সালে মার্কিন শিক্ষাবিদ ফ্র্যাঙ্ক লাইম্যান প্রবর্তন করেন। তিনি দেখেছিলেন, শ্রেণিকক্ষে সাধারণত কয়েকজন শিক্ষার্থীই সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, আর অধিকাংশ শিক্ষার্থী নীরব দর্শকের মতো বসে থাকে। এই বৈষম্য দূর করার জন্য তিনি এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ভাবার, আলোচনার এবং মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়া হবে। এই কৌশল তিনটি ধাপে পরিচালিত হয়- থিংক, পেয়ার এবং শেয়ার। যেখানে থিংক মানে স্বতন্ত্র চিন্তা, পেয়ার মানে সহযোগিতামূলক আলোচনা এবং শেয়ার মানে সমষ্টিগত আলোচনা বুঝানো হয়েছে।

প্রথম ধাপে শিক্ষক একটি উন্মুক্তধর্মী প্রশ্ন করেন এবং শিক্ষার্থীদের কিছু সময় দেন নিজে নিজে ভাবার জন্য। দ্বিতীয় ধাপে শিক্ষার্থীরা জোড়ায় আলোচনা করে নিজেদের ভাবনা বিনিময় করে। তৃতীয় ধাপে তারা পুরো শ্রেণির সামনে নিজেদের যৌথ মতামত উপস্থাপন করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী শুধু তথ্য গ্রহণকারী নয়, বরং জ্ঞান নির্মাণের সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠে।

শিক্ষা দার্শনিকদের দৃষ্টিতে এই পদ্ধতির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। মার্কিন দার্শনিক জন ডিউই মনে করতেন, ‘শিক্ষা জীবনযাপনের প্রস্তুতি নয়; শিক্ষা নিজেই জীবন।’ তাঁর মতে শিক্ষা হবে অভিজ্ঞতাভিত্তিক এবং অংশগ্রহণমূলক। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার্থী বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক যোগাযোগেরমাধ্যমে সবচেয়ে ভালো শেখে। ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ পদ্ধতি ডিউয়ের এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ। এখানে শিক্ষার্থীরা আলোচনা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান গড়ে তোলে। রুশ মনোবিজ্ঞানী লেভ ভাইগটস্কি শিক্ষাতাত্ত্বিক সামাজিক শিখন তত্ত্বে বলেন, শেখা একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। তিনি ‘জোন অব প্রোক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (জেডপিডি)’ ধারণা উপস্থাপন করেন, যেখানে একজন শিক্ষার্থী অন্যের সহযোগিতায় নিজের সামর্থ্যরে চেয়ে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ‘পেয়ার’ ধাপে শিক্ষার্থীরা যখন সহপাঠীর সঙ্গে আলোচনা করে, তখন তারা একে অপরকে শেখায় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন ধারণা অর্জন করে। ফলে শিক্ষণ আরও গভীর ও স্থায়ী হয়। অন্যদিকে সুইস মনোবিজ্ঞানী ও নির্মাণবাদী জ্যাঁ পিয়াজে শিক্ষাতত্ত্বে বলেন, শিশুরা নিজের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার মাধ্যমে জ্ঞান নির্মাণ করে। তার মতে, শিক্ষা মানে প্রস্তুত জ্ঞান সরবরাহ এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থী নিজেই জ্ঞান আবিষ্কার করতে পারে। ‘থিংক’ ধাপটি শিক্ষার্থীর সেই স্বাধীন চিন্তার জগৎ তৈরি করে। ব্রাজিলীয় শিক্ষাদার্শনিক পাওলো ফ্রেইরে প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেম অব এডুকেশন-এর সমালোচনা করেছিলেন, যেখানে শিক্ষক শুধু তথ্য জমা রাখেন আর শিক্ষার্থী তা গ্রহণ করে। তিনি মুক্তচিন্তা ও সংলাপনির্ভর শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীর মধ্যে এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে সংলাপ তৈরি হয়, তা ফ্রেইরে-এর মুক্তিকামী শিক্ষাদর্শের প্রতিফলন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় এই পদ্ধতির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। শিক্ষাবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ ব্যবহার করলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে অন্তর্মুখী বা দুর্বল শিক্ষার্থীরাও নিজেদের মতপ্রকাশে আগ্রহী হয়ে ওঠে। গবেষক লাইম্যান-এর মতে, এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং মৌখিক যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করে। শিক্ষা গবেষক কেগান (১৯৯৪) সমবায়ী শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর গবেষণায় দেখান, দলগত আলোচনা শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা এবং সৃজনশীল চিন্তাকে শক্তিশালী করে। কারণ একজন শিক্ষার্থী যখন অন্যের মতামত শোনে, তখন সে নিজের ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শেখে। এতে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যুগে ২১শ’ শতাব্দীর দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এবং ইউনেস্কো-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে সহযোগিতা, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে আধুনিক শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ এই চারটি দক্ষতা বিকাশে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রেও এই পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। এখনও অনেক শ্রেণিকক্ষে মুখস্থনির্ভর ও শিক্ষক-কেন্দ্রিক শিক্ষা প্রচলিত। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভোগে। ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত, ভাষা শিক্ষা এবং সামাজিক বিজ্ঞান পাঠদানে এটি অত্যন্ত কার্যকর।

উদাহরণ হিসেবে বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক যদি প্রশ্ন করেন, ‘বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পেলে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়ে?’ তখন শিক্ষার্থীরা প্রথমে নিজে চিন্তা করবে। পরে জোড়ায় আলোচনা করে বায়ুদূষণের কারণ ও ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে মতবিনিময় করবে। শেষে তারা পুরো শ্রেণির সামনে নিজেদের ধারণা উপস্থাপন করবে। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু তথ্য জানবে না, বরং পরিবেশগত সমস্যা বিশ্লেষণ, কারণ ব্যাখ্যা এবং সমাধান নিয়ে ভাবতে শিখবে। এই পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি শিক্ষার্থীদের ভয় ও জড়তা দূর করে। অনেক শিক্ষার্থী পুরো ক্লাসের সামনে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু প্রথমে একা চিন্তা করা এবং পরে বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগ তাদের আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। ফলে তারা সহজেই নিজের মতপ্রকাশ করতে পারে। তবে এই পদ্ধতি সফল করতে শিক্ষকের দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হতে হবে চিন্তানির্ভর ও উন্মুক্তধর্মী। শিক্ষককে সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের মতামতকে সম্মান করতে হবে। একইসঙ্গে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভুল উত্তরকে ব্যর্থতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে দেখা হবে। বিশ্বকবি রবি ঠাকুর শিক্ষা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মনকে মুক্ত করা।’ প্রকৃতপক্ষে ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ সেই মুক্ত চিন্তারই অনুশীলন। এটি শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বরং জীবনকে বুঝতে শেখায়। ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ শুধু একটি শিক্ষণ-কৌশল নয়, এটি একটি চিন্তানির্ভর ও মানবিক শিক্ষাদর্শ। এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের নীরব শ্রোতা থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে রূপান্তরিত করে। তারা ভাবতে শেখে, মতপ্রকাশ করতে শেখে এবং অন্যের মতামতকে সম্মান করতে শেখে। এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে সহযোগিতামূলক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়। বর্তমান বিশ্বে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও দলগত কাজের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ‘থিংক-পেয়ার-শেয়ার’ এসব দক্ষতা বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে এবং শেখার প্রতি আগ্রহী হয়। তাই প্রতিটি শিক্ষকের উচিত শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত এ কৌশলের চর্চা করা। এতে শিক্ষা হবে আরও প্রাণবন্ত, আনন্দময় ও অর্থবহ।

ফয়সল আহমদ বাবুল

প্রাবন্ধিক, সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সিলেট