মাদক প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
তৌসিফ রেজা আশরাফী
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাদক শুধু একজন মানুষের জীবন ধ্বংস করে না, এটি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে। আধুনিক বিশ্বে মাদকাসক্তি এমন এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে গ্রাস করছে। প্রযুক্তির বিস্তার, সহজলভ্যতা, কৌতূহল, বন্ধুবান্ধবের নেতিবাচক প্রভাব, পারিবারিক অবহেলা এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব মাদক গ্রহণের প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলছে। ফলে মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩১ কোটি ৬০ লাখ (৩১৬ মিলিয়ন) মানুষ অন্তত একবার মাদক ব্যবহার করেছে, যা ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত এক দশকে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং তরুণদের মধ্যেই এর বিস্তার সবচেয়ে উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মাদকাসক্তিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির মতে, মাদকাসক্তির চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ অনেক বেশি কার্যকর এবং ব্যয়সাশ্রয়ী। তাই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাদকসেবীদের একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণ। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের বিস্তার তরুণ সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনা, পারিবারিক অবহেলা এবং তদারকির অভাব মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। পরিবারে ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ এবং খোলামেলা যোগাযোগ থাকলে সন্তানের বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ধরনের অনলাইন কনটেন্ট দেখছে এবং তার আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেদিকে অভিভাবকদের সচেতন নজর রাখতে হবে।
অনেক সময় দেখা যায়, বাবা-মা অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানের মানসিক চাহিদার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেন না। এই শূন্যতাকে কাজে লাগায় অসৎ বন্ধু বা মাদক ব্যবসায়ীরা। তাই সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় কাটানো, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের মাদক অপব্যবহারবিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট (এনআইডিএ)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব শিশু ও কিশোর পারিবারিক তত্ত্বাবধান, মানসিক সমর্থন এবং নৈতিক শিক্ষা পায়, তাদের মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অর্থাৎ একজন সচেতন অভিভাবকই হতে পারেন সন্তানের প্রথম মাদকবিরোধী রক্ষাকবচ। পরিবারে যদি ধূমপান, মাদক বা সহিংস আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে শিশুরাও তা অনুসরণ করার ঝুঁকিতে থাকে। তাই সন্তানকে ভালো অভ্যাস শেখানোর আগে পরিবারের সদস্যদের নিজেদের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একজন শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, নৈতিকতা, মানবিকতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জীবনদক্ষতার শিক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত মাদকবিরোধী সেমিনার, সচেতনতামূলক আলোচনা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জীবনদক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা এবং মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হয়, সেখানে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। শিক্ষকদের উচিত শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার প্রতিও নজর রাখা। কোনো শিক্ষার্থীর আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন, অনুপস্থিতি বৃদ্ধি, পড়াশোনায় অমনোযোগ বা সন্দেহজনক মেলামেশা দেখা গেলে দ্রুত অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজের সমন্বিত ইতিবাচক ভূমিকা কিশোরদের মাদক গ্রহণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। একইভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর বিভিন্ন সামাজিক সূচকভিত্তিক প্রতিবেদনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীদের বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকির মধ্যে মাদকাসক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। অনেক সময় অনলাইনে মাদককে আধুনিকতা বা ফ্যাশনের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধির দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মাদক প্রতিরোধে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করলে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
মাদকের বিরুদ্ধে কেবল আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কঠোর আইন প্রয়োজন, তবে তার পাশাপাশি দরকার সচেতন পরিবার, দায়িত্বশীল শিক্ষক, মানবিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ। প্রতিরোধই এখানে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
আজকের একজন কিশোরই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বিচারক কিংবা উদ্যোক্তা। তাদের যদি মাদকের অন্ধকার থেকে রক্ষা করা যায়, তবে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হোক প্রতিটি পরিবার থেকে, শক্তিশালী হোক প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থান, জাগ্রত হোক সামাজিক সচেতনতা। কারণ একটি সন্তানকে মাদক থেকে রক্ষা করা মানেই একটি পরিবারকে রক্ষা করা, একটি পরিবারকে রক্ষা করা মানেই একটি জাতির ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা।
তৌসিফ রেজা আশরাফী
লেখক ও কলামিস্ট, সৈয়দপুর, নীলফামারী
