খাদ্যের অপচয় কমাতে হবে
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাঁচতে ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মানুষের পরিমিত খাদ্য গ্রহণ আবশ্যক। কিন্তু এই খাদ্য যখন পরিমিত-অপরিমিত এর বাধ ভেঙে বিনষ্ট হয়, তখন তা মহামারিতে রূপ নেয়। একদিকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টির সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করছে, অন্যদিকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয়ের মাধ্যমে নষ্ট হচ্ছে। যে খাদ্য একজন ক্ষুধার্ত, অভুক্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, সেই খাদ্যই অসচেতনতা, অপব্যবহার ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আবর্জনার স্তূপে চলে যায়। এই বৈপরীত্য শুধু বিবেককে নাড়া দেয় না, বরং আমাদের খাদ্যব্যবস্থা, ভোগসংস্কৃতি এবং দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তাই খাদ্যের অপচয় এখন একটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক এবং পরিবেশগত সংকট। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ধান, সবজি, ফলমূল, মাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে।
কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির এই সাফল্যের পাশাপাশি খাদ্য সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়টি এখনও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। ফলে মাঠ থেকে বাজার, বাজার থেকে রান্নাঘর এবং রান্নাঘর থেকে খাবারের টেবিল প্রতিটি ক্ষেত্রেই কমবেশি খাদ্য অপচয় হচ্ছে। খাদ্যের অপচয় এখন একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় , ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১.০৫ বিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় হয়েছে, যা ভোক্তাদের জন্য উপলব্ধ মোট খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ।
অর্থাৎ, প্রতি পাঁচ ভাগ খাদ্যের প্রায় এক ভাগই মানুষের পাতে না গিয়ে অপচয় হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য পায়নি। এই বৈপরীত্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যের অপচয় রোধ করাও কতটা জরুরি। অন্যদিকে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) জানিয়েছে, ফসল সংগ্রহের পর থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ১৩.২ শতাংশ খাদ্য নষ্ট হয়ে যায়। একই সঙ্গে খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের জন্য দায়ী। অর্থাৎ, খাদ্যের অপচয় শুধু ক্ষুধার সংকট বাড়ায় না; এটি জলবায়ু পরিবর্তনকেও ত্বরান্বিত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের কঠোর পরিশ্রম, জমি, পানি, সার, বিদ্যুৎ ও শ্রমের সমন্বয়ে যে খাদ্য উৎপাদিত হয়, তার একটি বড় অংশ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। আবার পরিবার, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিয়ে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশন করার প্রবণতা অপচয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই প্লেটে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার নেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর খেতে পারেন না। এই অভ্যাস পরিবর্তন করা ভবিষ্যৎ সংকট বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ।
খাদ্যের অপচয়ের সঙ্গে আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিরও সম্পর্ক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি খাবারের আয়োজনকে আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অথচ অতিরিক্ত রান্না করা খাবারের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ফেলে দিতে হয়। সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের এই প্রবণতা শুধু অর্থের অপচয় নয়, জীবনের প্রয়োজন খাদ্যেরও অপচয় ঘটায়। আমাদের বুঝতে হবে, অতিথিকে সম্মান জানানো আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার নষ্ট করা একই বিষয় নয়। পরিবার থেকেই সচেতনতার শুরু হওয়া উচিত। বাজারে যাওয়ার আগে প্রয়োজন অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা, অতিরিক্ত খাদ্য না কেনা, যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু রান্না করা, প্লেটে প্রয়োজনমাফিক খাবার নেওয়া এবং অবশিষ্ট খাবার নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করে পরে ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুদেরও ছোটবেলা থেকেই খাদ্যের মূল্য শেখানো প্রয়োজন। কারণ আজকের সচেতন শিশুই আগামী দিনের দায়িত্বশীল নাগরিক।
হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোও খাদ্যের অপচয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছোট ও বড় পরিমাণে খাবার পরিবেশনের সুযোগ রাখা, উদ্বৃত্ত নিরাপদ খাবার দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অপচয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বৃত্ত নিরাপদ খাবার সংগ্রহ ও বিতরণের জন্য ‘ফুড ব্যাংক’ কার্যক্রম ইতোমধ্যে সফল হয়েছে।
বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সরকারের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ । আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা, ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খাদ্য ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে খাদ্যের অপচয় রোধে গণসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। খাদ্যের প্রতি সম্মান দেখানো মানে শুধু একটি খাবারকে সম্মান করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কৃষকের শ্রম, প্রকৃতির সম্পদ এবং রাষ্ট্রের বিনিয়োগকেও সম্মান করা।
একটি ভাতের দানার পেছনে যে ঘাম, সময় ও শ্রম রয়েছে, তা উপলব্ধি করতে পারলে খাদ্যের অপচয় অনেকটাই কমে আসবে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ১২.৩)- এর অন্যতম লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু খাদ্য অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ- সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা প্রায়ই বলি, খাদ্যই জীবন। যদি সত্যিই তা বিশ্বাস করি, তবে খাদ্যের প্রতি আমাদের আচরণেও সেই সম্মান প্রতিফলিত হওয়া উচিত। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার না নেওয়া, অবশিষ্ট খাবারের সঠিক ব্যবহার এবং অপচয়কে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করার মধ্য দিয়েই একটি দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে উঠতে পারে। মনে রাখতে হবে, আজ যে খাবার আমরা অবহেলায় ফেলে দিচ্ছি, সেটিই হয়তো অন্য কারও জন্য একবেলার আহার হতে পারত। তাই খাদ্যের অপচয় কমানো কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়; এটি মানবিক দায়িত্ব, পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম শর্ত।
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
