শিশু শোষণের গোপন বাজার
আমানুর রহমান
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল যুগের চকচকে মুখোশের আড়ালে যে ভয়ংকর অন্ধকার জগৎ লুকিয়ে আছে, তা আজ আর কারও অজানা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন বিশ্বকে একটি সীমানাহীন গ্রামে পরিণত করেছে, তেমনি এর ভেতরেই গড়ে উঠেছে নির্মম শোষণের এক গোপন বাজার। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। এত বিশাল এক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যখন এমন বিষাক্ত জাল বিস্তারের ঘটনা ঘটে, তখন তা শুধু প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়; বরং আমাদের সমগ্র সভ্যতার এক গভীর নৈতিক অবক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ। অভিভাবকেরা যখন সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন, তখন হয়তো ঘুণাক্ষরেও টের পান না যে, তারা তাদের সন্তানদের এক অদৃশ্য শ্বাপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।
ডিজিটাল এই শোষণচক্রের কার্যকৌশল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও ভয়াবহ, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। ‘বিবিসি আই’-এর প্রতিবেদক দিব্যা আর্য তার নিরলস অনুসন্ধানে উদ্ঘাটন করেছেন যে, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের ফিডে অত্যন্ত কৌশলে শিশু নির্যাতনমূলক বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীদের সরাসরি টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপে নিয়ে যায়, যেখানে টাকার বিনিময়ে নির্দ্বিধায় বিক্রি হচ্ছে নির্যাতনের ভিডিও।
এর অর্থ দাঁড়ায়, মেটার মতো প্রযুক্তি জায়ান্ট তাদের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে এমন জঘন্য অপরাধ থেকে অর্থ উপার্জন করছে। যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছিল সৃজনশীলতা ও আনন্দ ভাগাভাগির জন্য, সেটিই এখন নিঃশব্দে পরিণত হচ্ছে এক নরককুণ্ডে; যেখানে শিশুদের কোমলমতি দেহ ও মনকে পণ্য হিসেবে কেনাবেচা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রকেরা যখন তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তখন তার ভয়াবহ প্রভাব গিয়ে পড়ে বাস্তব জগতের নিরাপরাধ মানুষের ওপর। অনুসন্ধানের প্রয়োজনে দিব্যা আর্য ভারতীয় সাইবার পুলিশের দ্বারস্থ হন এবং কথা বলেন মেটার এক সাবেক কর্মকর্তার সঙ্গে, যিনি বর্তমানে ‘হুইসেলব্লোয়ার’ হিসেবে সিস্টেমের ত্রুটিগুলো ফাঁস করেছেন। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করেও এসব বিজ্ঞাপন আটকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যা প্রমাণ করে- মুনাফার অন্ধ খেলায় তাদের কাছে মানবিক মূল্যবোধের কোনো দাম নেই।
মেটা অবশ্য দাবি করেছে, তারা শিশু শোষণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং নীতি লঙ্ঘনকারী বিজ্ঞাপনগুলো সরিয়ে ফেলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত অবহিত করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের তথাকথিত এই সুরক্ষা প্রাচীর বারবার ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা, আর সেই সুযোগে প্রতিদিন হাজারো শিশু পরিণত হচ্ছে অসহায় শিকারে।
?অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা বা জবাবদিহির আওতায় আনার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এই কালোবাজার আরও প্রশস্ত হচ্ছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এই প্রতিবেদনকে অত্যন্ত গুরুতর আখ্যা দিয়ে বলেছেন, বিষয়টি এতটাই জটিল ও মারাত্মক যে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এখানে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই এখনই সময় এসেছে, ডিজিটাল অপরাধকেও শারীরিক নির্যাতনের সমতুল্য গুরুত্ব দিয়ে অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর। এ ধরনের যেকোনো অপরাধ শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে সরকারি সংস্থাগুলোকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে আরও দক্ষ ও সজাগ হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন লাগামহীন স্বাধীনতা আর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না; কারণ আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস কাম্য হতে পারে না।
?আমাদের সবাইকে মিলে একটি কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ডিজিটাল জগৎ শিকারের কোনো নির্মম প্রান্তর হওয়ার বদলে আমাদের সন্তানদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মুনাফার লোভে মানবিকতার এই চরম অবমূল্যায়ন সমাজের জন্য এক মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। মনে রাখতে হবে, আজ এই শিশুদের পাশে না দাঁড়ালে আগামীকাল সমাজে আর কোনো নিরাপদ আশ্রয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে না। ডিজিটাল মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এসব নরপিশাচের বিরুদ্ধে এখনই রুখে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব; অন্যথায় ইতিহাস আমাদের এই উদাসীনতাকে কখনোই ক্ষমা করবে না।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ
