স্মৃতি যখন বোঝা : আধুনিকতার মোড়কে পরিচয়হীনতার সংকট
আরিফুল ইসলাম রাফি
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিবর্তন আর পরিবর্তনের অপ্রতিরোধ্য গতিময়তায় মানুষ আজ সভ্যতার এমন এক চূড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে তাকানোর অবকাশটুকুও অবান্তর মনে হয়। আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে গতি, দিয়েছে বৈশ্বিক নাগরিক হওয়ার লাইসেন্স; কিন্তু বিনিময়ে অলক্ষ্যেই কেড়ে নিয়েছে আমাদের সঞ্চিত স্মৃতির এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ভাণ্ডার, যাকে একসময় আমরা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি কিংবা অস্তিত্বের নোঙর বলে গৌরব করতাম। আজ সেই গৌরব একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-আধুনিক মানুষের পিঠে এক ভারী, অপ্রাসঙ্গিক বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়।
যে স্মৃতি একদা মানুষকে তার আত্মপরিচয়ের হদিস দিত, গোলকধাঁধায় পথ দেখাত, সেই স্মৃতিই আজ কর্পোরেট আধুনিকতার চাকচিক্যের ভিড়ে সেকেলে, প্রগতির অন্তরায় এবং এক প্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক জঞ্জাল বলে গণ্য হচ্ছে। অতীতকে ভুলে যাওয়ার এই যে তীব্র তাড়না, যা শুধু ব্যক্তির স্মৃতিবিস্মৃতি নয়, বরং আমাদের ক্রমশ এক অতল পরিচয়হীনতার সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই মননশীল সংকটের ভেতরে যে দার্শনিক ও সামাজিক চোরাবালি লুকিয়ে আছে, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা আজ অত্যন্ত জরুরি।
আমরা এখন বাস করছি এক ‘ফাস্ট-ফরোয়ার্ড’ বা দ্রুতগতির হাইপার-রিয়েল যুগে, যেখানে নতুনের আহ্বান যতখানি উগ্র এবং সর্বগ্রাসী, পুরাতনের বিদায় ততখানিই নিঃশব্দ ও নির্মম।
বিশ্বায়নের এই যুগে কর্পোরেট পুঁজিবাদের প্রধান শর্তই হলো সংস্কৃতির একজাতীয়করণ। এই ব্যবস্থাটি আমাদের শেখাচ্ছে কীভাবে পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষকে একই রকমের কৃত্রিম পোশাক পরতে হবে, একই ভাষায়, একই ভঙ্গিতে কথা বলতে হবে এবং একই বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের অন্ধ ভোক্তা হতে হবে। এই জাঁকজমকপূর্ণ বৈশ্বিক মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার ইঁদুরদৌড়ে আমাদের নিজস্ব লোকগাথা, মায়ের মুখের আঞ্চলিক ভাষার সূক্ষ্ম ও গভীর মাধুর্য, শতবর্ষী উৎসবের ভেতরের সাম্যবাদী দর্শন কিংবা যৌথ পরিবারের সেই নিবিড় আত্মিক বন্ধনগুলো বড্ড বেমানান এবং পশ্চাৎপদ ঠেকছে।
আধুনিক মানুষ অবচেতনভাবেই ধরে নিয়েছে, প্রাচীন স্মৃতির বোঝা বহন করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। ফলে, প্রগতির আধুনিক চাদর গায়ে জড়াতে গিয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের শেকড়কে, যাকে সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের ভাষায় বলা হচ্ছে ‘সাংস্কৃতিক স্মৃতিভ্রংশ’ বা কালচারাল অ্যামনেসিয়া। এই স্মৃতিভ্রংশতা কোনো প্রাকৃতিক রোগ নয়, এটি বাজার অর্থনীতির দ্বারা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উৎপাদিত একটি মনস্তাত্ত্বিক পণ্য।
ফরাসি দার্শনিক জঁ বোদরিয়ারের ‘হাইপার-রিয়েলিটি’ বা অতি-বাস্তবতার তত্ত্বের দিকে তাকালে এই সংকটের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। বোদরিয়ার দেখিয়েছিলেন, আধুনিক সমাজে আসল বস্তু বা ঘটনার চেয়ে তার যে প্রতিনিধিত্ব বা মিডিয়া ইমেজ, তা মানুষের কাছে বেশি সত্য হয়ে ওঠে। আজ আমাদের লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ উৎসব কিংবা নিজস্ব ঘরানার শিল্পকলা যখন কোনো কর্পোরেট স্পনসরের অধীনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টুডিওতে রি-ব্র্যান্ডিং হয়ে আসে, তখন তার ভেতরের আদিম ও অকৃত্রিম প্রাণসত্তাটি মরে যায়। সেখানে অবশিষ্ট থাকে শুধু একধরণের পণ্য-সংস্কৃতি। নতুন প্রজন্ম মাটির গন্ধযুক্ত আসল লোকায়ত জীবনকে চেনে না, তারা চেনে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা তার গ্ল্যামারাইজড সংস্করণকে। ফলে, আসল স্মৃতিটি প্রতিস্থাপিত হচ্ছে একটি কৃত্রিম ও নকল স্মৃতি দিয়ে। এই কৃত্রিমতা যখন সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষের আত্মপরিচয়ও এক ধরণের প্লাস্টিক রূপ ধারণ করে।
এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় শিকার আমাদের তরুণ প্রজন্ম। তাদের রুচিবোধ ও চিন্তাপ্রক্রিয়ার দিকে তাকালে এক ধরণের গভীর শূন্যতা বা অস্তিত্ববাদী সংকট চোখে পড়ে। আমাদের লোকসংগীতের যে দীর্ঘ আধ্যাত্মিক, লালনপন্থী কিংবা বাউল দর্শনের গভীরতা ছিল, যা মানুষকে মহাবিশ্বের সঙ্গে মেলাত, তা আজ যান্ত্রিক কোলাহলের নিচে চাপা পড়ে গেছে। দাদী-নানীর মুখের যে উপকথা বা রূপক গল্পগুলো এক সময় অবলীলায় শিশুর নৈতিকতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও প্রকৃতির সঙ্গে মিতালির ভিত্তি গড়ে দিত, তার স্থান দখল করেছে স্ক্রিনের ভিনদেশী অ্যানিমেশন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি করা অতি-রোমাঞ্চকর অবাস্তব জগৎ। এর ফলে তরুণেরা এক ধরণের বহিরাগত সংস্কৃতিকে অন্ধভাবে অনুকরণ করছে ঠিকই, কিন্তু যেহেতু সেই সংস্কৃতির ঐতিহাসিক শিকড় তাদের মনস্তত্ত্বের গভীরে নেই, তাই তারা সেটিকে পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারছে না। আবার অন্যদিকে, নিজেদের আদি শিকড়কে তারা প্রগতির পরিপন্থী ভেবে বর্জন করেছে। মাঝখান থেকে তারা ঝুলে রয়েছে এক ত্রিশঙ্কু অবস্থায়, না পারছে পুরোপুরি বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশ হতে, না পারছে খাঁটি দেশীয় ঐতিহ্যের ভেতর শান্তি খুঁজে পেতে।
যদি জার্মান-কোরিয়ান দার্শনিক বাইয়ুং-চুল হান-এর ‘বার্নআউট সোসাইটি’ বা ক্লান্তির সংস্কৃতির লেন্স দিয়ে আমরা এই বিষয়টিকে দেখি, তবে আরেকটি ভয়াবহ দিক উন্মোচিত হয়। হান বলছেন, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে বাইরে থেকে জোর করে খাটায় না; বরং মানুষের মনে এমন এক বিভ্রম তৈরি করে যাতে মানুষ নিজেই নিজের শোষক হয়ে ওঠে। সারাক্ষণ ‘আমাকে সফল হতে হবে’, ‘আমাকে আরও আধুনিক হতে হবে’, ‘আমাকে ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে’, এই যে আত্মণ্ডউন্মাদনা, এটি মানুষকে তার আত্মিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
মানুষ যত বেশি তার ঐতিহ্যকে ভুলবে, সে তত বেশি একাকী হবে; আর মানুষ যত বেশি একাকী হবে, সে তত বেশি বাজার-নির্ভর উপভোক্তায় পরিণত হবে। একাকীত্বের এই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণই সাংস্কৃতিক স্মৃতিভ্রংশের সবচেয়ে বড় অনুঘটক। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, কোনো একটি জনপদ বা জাতিকে যদি দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু ও দাস বানিয়ে রাখতে হয়, তবে তার ওপর সামরিক হামলা করার চেয়ে তার ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক নোঙরটি কেটে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই কাজটিই করত বন্দুকের নলে; আর বর্তমানের নজরদারি পুঁজিবাদ এই কাজটি করছে আমাদের হাতের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, বিনোদনের মোড়কে। আমাদের অবচেতন মনে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, যা কিছু প্রাচীন, যা কিছু আমাদের নিজস্ব, তা দুঃখের, তা দারিদ্র্যের, তা লজ্জার। আর যা কিছু পশ্চিমা, যা কিছু কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত তা-ই একমাত্র আনন্দের ও সম্মানের। এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের কারণে আমরা আমাদের নিজেদের ভাষা ও ইতিহাসের ওপর এক ধরণের হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করেছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, সংস্কৃতি কোনো স্থবির, জাদুঘরে বন্দি করে রাখার মতো বস্তু নয়; এটি একটি বহমান নদী।
পরিচয়হীনতার এই সর্বগ্রাসী মনস্তাত্ত্বিক সংকট থেকে যদি আমরা আমাদের মুক্তি নিশ্চিত করতে চাই, তবে প্রগতির উপাদানগুলোকে ধারণ করার পাশাপাশি আমাদের ভেতরের সেই অবদমিত, ধুলোপড়া স্মৃতির খতিয়ানটি নতুন করে মেলতে হবে। আমাদের তরুণদের শেখাতে হবে কীভাবে প্রযুক্তির শিখরে চড়েও মাটির গভীরে শিকড় গেড়ে রাখা যায়। বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর আগে আমাদের আপন কৃষ্টির গভীরতায় ডুব দিতে হবে; অন্যথায়, এই কৃত্রিম আধুনিকতার রঙিন চাদরটি যখন সময়ের নিয়মে একদিন জীর্ণ হয়ে ছিঁড়ে যাবে, তখন আমরা প্রত্যেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখব এক বিশাল, অন্ধকার শূন্যতা এবং পরিচয়হীনতার দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আমাদের আর কোনো নিজস্ব অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই।
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
