পাহাড়ধসের পুনরাবৃত্তি ও আমাদের উদাসীনতা আর কত মৃত্যু হলে টনক নড়বে?
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাঙামাটিতে গত পাঁচ দিনেরটানা ভারী বর্ষণে জেলার অন্তত ৬০টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলের উপচে পড়া পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবনের চরম ঝুঁকি। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ জেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অসংখ্য ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়েছে কিংবা আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। আশঙ্কাজনক এই পরিস্থিতির মুখে জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে এবং তাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বাস করা মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার চরম অনীহা। প্রশাসনের বারবার তাগিদ সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ঘরেই অবস্থান করছেন। পাহাড়ধসের এই চেনা ট্র্যাজেডির সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে- মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আমাদের এই উদাসীনতা আর কতদিন চলবে?
ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধস এখন আর কোনো নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ার ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালের সেই ভয়াবহ পাহাড়ধসের স্মৃতি এখনও পার্বত্যবাসীর মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে, যেখানে পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছিলেন শতাধিক মানুষ। এরপরও কেন পাহাড়ের পাদদেশে এই ঝুঁকিপূর্ণ জনবসতি বন্ধ করা গেল না, তা এক মস্ত বড় প্রশ্ন। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল ধ্বংস করা এবং মাটির চরিত্র বিবেচনা না করে বসতি স্থাপন করার কারণেই আজ প্রকৃতির এই ভয়াবহ প্রতিশোধ। এবারের দুর্যোগেও বাঘাইছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে; কলেজ ও উপজেলা পরিষদসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই চিত্র প্রমাণ করে, সংকটের গভীরতা কতখানি তীব্র।
সংকটের মূল চিত্র ও বড় চ্যালেঞ্জগুলো
৬০টি স্থানে ধস : মাত্র কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে পাহাড়ধসের এই উচ্চ সংখ্যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা : রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জরুরি উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণ ব্যাহত হচ্ছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনীহা : কাপ্তাইসহ বিভিন্ন উপজেলার সিংহভাগ আশ্রয়কেন্দ্র এখনও ফাঁকা, মানুষ ঘরের মায়ায় জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে।
নিম্নাঞ্চল প্লাবন : পাহাড়ি ঢলে বাঘাইছড়ির হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিলেও তা মোট ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যার তুলনায় খুবই নগণ্য। যেমন কাপ্তাই উপজেলার ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ৩টিতে মানুষ উঠেছে, বাকি ১৫টিই ফাঁকা পড়ে আছে। মানুষ কেন আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না, তার মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং গৃহপালিত পশু ও আসবাবপত্র চুরির ভয় মানুষকে নিজের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধা দেয়। কিন্তু সম্পদের মায়ায় অমূল্য জীবনের এই ঝুঁকি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। জেলা প্রশাসনকে শুধু মাইকিং বা বিজ্ঞপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে জোরপূর্বক হলেও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। প্রয়াতদের কান্নায় বাতাস ভারী হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
পাহাড়ধসের এই চলমান সংকট থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পেতে হলে আমাদের স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি- উভয় পরিকল্পনার দিকে এগোতে হবে। শুধু দুর্যোগের সময় মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা কোনো টেকসই সমাধান নয়। প্রথমত, পাহাড়ের পাদদেশে যেকোনো ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী বসতি স্থাপন আইন করে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা বছরের পর বছর ধরে ভূমিহীন হিসেবে পাহাড়ে বাস করছেন, তাদের জন্য সমতলে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। তৃতীয়ত, পাহাড় কাটা ও নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধে বন বিভাগ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চলের ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন করা প্রয়োজন যাতে বৃষ্টির পানি আটকে পাহাড়ের মাটিকে আলগা করতে না পারে।
আপাতত রাঙামাটিতে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমেছে এবং জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যদি রোদ ওঠে তবে হয়তো সাময়িকভাবে পানি নেমে যাবে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু প্রকৃতির এই ক্ষণিকের শান্ত রূপ আমাদের যেন আবার এক দীর্ঘমেয়াদি ঘুমে আচ্ছন্ন না করে দেয়। আজ যদি আমরা এই ৬০টি পাহাড়ধসের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নিই, তবে আগামীকালের ভারী বৃষ্টিতে যে আরও বড় বিপর্যয় ঘটবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। পাহাড়ের মানুষের জীবন বাঁচাতে পাহাড় ও প্রকৃতির ওপর মানুষের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে এবং একইসঙ্গে নাগরিকদের নিজেদের জীবনের সুরক্ষায় সচেতন হতে হবে। আর কোনো প্রাণহানি আমরা দেখতে চাই না; পার্বত্য অঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।
