হতাশার ভিড়ে আশার সন্ধানে

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চারপাশে তাকালেই একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে- হতাশা যেন নীরব এক মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কলেজের করিডোরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, লাইব্রেরির নীরব কোণে, চায়ের দোকানের আড্ডায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসংখ্য পোস্টে একই অনুভূতির প্রতিফলন দেখা যায়। কেউ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে, কেউ ক্যারিয়ার নিয়ে দিশাহারা, কেউ আবার পরিবার বা সমাজের প্রত্যাশার ভারে ক্লান্ত। বাইরে থেকে সবাইকে স্বাভাবিক মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে অনেকেই এক অদৃশ্য যুদ্ধ লড়ে চলেছে। আজকাল মনে হয়, আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি এই হতাশা।

কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অধিকাংশ তরুণ-তরুণীর সঙ্গে কথা বললেই বিষয়টি বোঝা যায়। কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে, কেউ চাকরির বাজার নিয়ে চিন্তিত, কেউ উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না- তা নিয়ে দুশ্চিন্তায়, আবার কেউ পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ সামলাতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। আমরা হাসি, গল্প করি, ছবি তুলি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকি; কিন্তু এর আড়ালে কতটা অস্থিরতা জমে আছে, তা অনেক সময় কেউই জানে না।

একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটাই ছিল বড় স্বপ্ন। ভর্তি হওয়ার পর মনে হতো, এবার সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এক সেমিস্টার শেষ হতে না হতেই নতুন প্রশ্ন সামনে আসে- সিজিপিএ কত হবে? এরপর কী? চাকরি, নাকি উচ্চশিক্ষা? দেশে থাকব, নাকি বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই অনেকের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।আমাদের সমাজেও অদৃশ্য এক প্রতিযোগিতা চলছে। কে আগে চাকরি পেল, কে বিদেশে গেল, কার বেতন কত, কে কত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হলো—এসব যেন সাফল্য মাপার একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিতদের অনেক সাধারণ প্রশ্নও কখনও কখনও মানসিক চাপের কারণ হয়ে ওঠে। ‘চাকরি কবে?’, ‘মাস্টার্সের পর কী করবে?’, ‘এখনও কিছু হলো না?’- এ ধরনের প্রশ্ন হয়তো খুব সহজভাবে করা হয়; কিন্তু যার উদ্দেশে বলা হয়, তার মনে এগুলো অনেক গভীর প্রভাব ফেলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

প্রতিদিন আমরা দেখি কারও নতুন চাকরির খবর, কারও বিদেশে পড়তে যাওয়ার ছবি, কারও সাফল্যের গল্প। দেখতে দেখতে অজান্তেই নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের জীবন তুলনা শুরু করি। অথচ আমরা ভুলে যাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ তার জীবনের উজ্জ্বল দিকগুলোই তুলে ধরে। সংগ্রাম, ব্যর্থতা, কান্না কিংবা অনিশ্চয়তার গল্প খুব কম মানুষই প্রকাশ করে। ফলে অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের বাস্তব জীবনকে অনেক সময় ছোট মনে হয়।

হতাশার আরেকটি কারণ হলো, আমরা সফলতার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে ফেলেছি। মনে করি, একটি নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে চাকরি পেতেই হবে, প্রতিষ্ঠিত হতেই হবে, নইলে জীবন ব্যর্থ। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

একই বয়সের দুই মানুষের জীবন কখনোই এক রকম হয় না। কেউ হয়তো ২৫ বছরেই নিজের স্বপ্ন পূরণ করে, আবার কেউ ৩৫ বছর বয়সে গিয়ে নিজের পথ খুঁজে পান। তবুও দুজনের জীবনই মূল্যবান। আমরা প্রায়ই শুনি- ’সৃষ্টিকর্তা যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।’

কথাটি হয়তো খুব সাধারণ শোনায়, কিন্তু এর গভীরতা অনেক। জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলোর অর্থ আমরা তখন বুঝতে পারি না। পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই ব্যর্থতা বা বিলম্বই হয়তো আমাদের জন্য ভালো ছিল। অনেক সময় যে সুযোগটি হাতছাড়া হয়েছে বলে আমরা কষ্ট পাই, সেটিই হয়তো আমাদের আরও ভালো কোনো পথের দিকে নিয়ে যায়। আমার মনে হয়, সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন। কেউ একটু আগে পায়, কেউ একটু পরে। তাই অন্যের সময়ের সঙ্গে নিজের সময় মিলিয়ে দেখার কোনো অর্থ নেই। আমাদের কাজ চেষ্টা করে যাওয়া। ফল কখন আসবে, সেটি অনেকটাই তাঁর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, শুধু অপেক্ষা করলেই হবে।

ধৈর্য মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। ধৈর্য মানে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, নিজের দক্ষতা বাড়ানো, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং বিশ্বাস রাখা যে পরিশ্রম কখনোই বৃথা যায় না।

আজ যে সময়টুকু আমাদের হাতে আছে, সেটিই ভবিষ্যৎ গড়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ।দুঃখের বিষয় হলো, আমরা ভবিষ্যতের কথা এত বেশি ভাবি যে বর্তমানটাকেই উপভোগ করতে ভুলে যাই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন জীবনের অন্যতম সুন্দর সময়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, শিক্ষকদের কাছ থেকে শেখা, নতুন বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া, ক্যাম্পাসের বিকেল কিংবা বৃষ্টিভেজা পথ- এসব একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে।

কিন্তু আমরা অনেকেই এই সুন্দর মুহূর্তগুলো উপভোগ না করে শুধু ভাবতে থাকি, ‘এরপর কী হবে?’ বাংলাদেশে প্রতি বছর হতাশা ও মানসিক চাপে গড়ে চার শতাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। আঁচল ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে এক বছরে মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এর মধ্যে হতাশা এবং মানসিক বিষণ্ণতার কারণে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। হতাশা মানুষকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, স্বপ্ন দেখার সাহস কেড়ে নেয়। তাই হতাশাকে অস্বীকার না করে, তাকে বুঝতে শেখা জরুরি। প্রয়োজনে নিজের কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। বন্ধু, পরিবার কিংবা শিক্ষক- কখনও কখনও একজন মনোযোগী শ্রোতাই একজন মানুষকে নতুন করে দাঁড়ানোর শক্তি দিতে পারেন।

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও বেশি আলোচনা হওয়া দরকার। ভালো ফলাফল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একজন শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেই একজন শিক্ষার্থী সফল নয়; সে মানসিকভাবে কতটা সুস্থ, সেটিও বিবেচনায় আনা উচিত। আরেকটি বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই- জীবন কোনো দৌড় নয়। এখানে সবার পথ আলাদা।

কেউ ধীরে হাঁটে, কেউ দ্রুত দৌড়ায়। তাই অন্যের গতি দেখে নিজের পথ বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। নিজের সামর্থ্য, নিজের স্বপ্ন এবং নিজের মূল্যবোধ অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় সাফল্য। আমরা যদি প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের উন্নত করি, নতুন কিছু শিখি, মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হই এবং সততার সঙ্গে কাজ করি, তাহলে সেই প্রচেষ্টা একদিন না একদিন ফল দেবে। হয়তো আজ নয়, কাল; কাল নয়তো তার পরের দিন। কিন্তু কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টাই একেবারে হারিয়ে যায় না। আমার বিশ্বাস, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলো অনেক সময় অপেক্ষার পরই আসে। তাই আজ যদি সবকিছু পরিকল্পনা মতো না-ও হয়, তবুও আশা হারানোর কোনো কারণ নেই। জীবনকে একটি দিনের ব্যর্থতা দিয়ে বিচার করা যায় না।

একটি পরীক্ষা, একটি চাকরি কিংবা একটি সুযোগ পুরো জীবনের সংজ্ঞা নয়। আমরা যদি বর্তমানকে গুরুত্ব দিই, প্রতিদিন নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি এবং সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখি, তাহলে ভবিষ্যতের ভয় অনেকটাই কমে যায়। কারণ ভবিষ্যৎ আমরা আজই তৈরি করছি। আজকের একটি ভালো সিদ্ধান্ত, একটি নতুন দক্ষতা, একটি বই পড়া কিংবা একটি সৎ কাজই আগামী দিনের ভিত্তি গড়ে দেয়।

হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর আজই পাওয়া যাবে না। হয়তো কাঙ্ক্ষিত সাফল্যও এখনই আসবে না। কিন্তু তাই বলে পথচলা থেমে থাকতে পারে না। জীবনের সৌন্দর্য শুধু গন্তব্যে নয়, পথচলার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। তাই আসুন, অযথা ভবিষ্যতের ভয়কে বুকে নিয়ে বর্তমানকে নষ্ট না করি। নিজের সামর্থ্যরে সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করি, অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা না করি এবং বিশ্বাস রাখি- সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা আমাদের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বড়। প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময় যখন আসবে, তখন প্রাপ্য জিনিসটি ঠিকই ধরা দেবে। হতাশা নয়, আশা হোক আমাদের পথচলার শক্তি। কারণ অন্ধকার যত দীর্ঘই হোক, ভোর একদিন আসবেই।

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।