ডিজিটাল সাম্রাজ্যবাদ : ডেটা যখন নতুন উপনিবেশ

সিনথিয়া ইসলাম খুশবু

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক সময় উপনিবেশবাদ মানেই ছিল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের দুর্বল রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল, সম্পদ লুট এবং নিজস্ব সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া। সময় বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু শোষণের ধরন বদলালেও তার উদ্দেশ্য বদলায়নি। আজকের বিশ্বে উপনিবেশবাদের নতুন নাম ‘ডিজিটাল সাম্রাজ্যবাদ’। এখানে কোনো সেনাবাহিনী নেই, নেই কামান বা যুদ্ধজাহাজ; আছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম এবং সর্বোপরি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বা ডেটা। বর্তমান বিশ্বে প্রায়ই বলা হয়, ডেটাই নতুন তেল। অর্থাৎ একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো মানুষের তথ্য। আমরা কোথায় যাই, কী দেখি, কী পড়ি, কী কিনি, কার সঙ্গে কথা বলি, কোন বিষয়ে হাসি বা কাঁদি; এসবই আজ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই তথ্যের মালিক কে? আমরা, নাকি সেই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো, যাদের প্ল্যাটফর্ম আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি?

আজ একজন মানুষ মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটক খুলতে গিয়েও কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে কাটিয়ে দেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয় নয়; বরং এমন অ্যালগরিদমের ফল, যা ব্যবহারকারীর মনোযোগ যত দীর্ঘ সময় সম্ভব ধরে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ব্যবহারকারীর প্রতিটি ক্লিক, রিয়্যাক্ট, মন্তব্য, সার্চ, এমনকি একটি ভিডিও কতক্ষণ দেখা হলো; এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তার সামনে এমন কনটেন্ট উপস্থাপন করা হয়, যা তাকে আরও বেশি সময় অনলাইনে রাখে।

আমরা প্রায়ই বলি, ‘ফেসবুক তো বিনামূল্যে ব্যবহার করি।’ কিন্তু প্রযুক্তি অর্থনীতির একটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো, যদি কোনো সেবার জন্য আপনি অর্থ প্রদান না করেন, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই আপনিই সেই পণ্য। কারণ আপনার মনোযোগ, আপনার তথ্য এবং আপনার অনলাইন আচরণই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসার অন্যতম ভিত্তি। আজ বিজ্ঞাপন আর সবার জন্য এক রকম নয়। আপনার বয়স, অবস্থান, পছন্দ, আগ্রহ এবং অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণ করে আপনার জন্য আলাদা বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে কোন সংবাদ আপনি আগে দেখবেন, কোন ভিডিও আপনার সামনে আসবে কিংবা কোন বিষয়ে আপনার আগ্রহ তৈরি হবে, এসবও অ্যালগরিদম প্রভাবিত করতে পারে। ফলে তথ্যপ্রবাহের ওপর মানুষের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ডিজিটাল সাম্রাজ্যবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংস্কৃতিক প্রভাব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু যখন একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা জীবনধারা অ্যালগরিদমের কারণে অতিরিক্ত প্রাধান্য পায় এবং স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্য ক্রমশ আড়ালে চলে যায়, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজ অনেক তরুণ-তরুণী বিদেশি ট্রেন্ড, ফ্যাশন কিংবা উৎসব সম্পর্কে যতটা জানে, নিজের দেশের ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি কিংবা সাহিত্য সম্পর্কে ততটা জানে না। এটি কোনো সংস্কৃতিকে দোষারোপ করার বিষয় নয়; বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোন বিষয়গুলো বেশি দৃশ্যমান হয়, সেই বাস্তবতা বোঝার বিষয়। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গভীর। বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আয় করছে। এই অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে উঠছে ব্যবহারকারীদের তৈরি করা তথ্যের ওপর। অর্থাৎ আমরা শুধু একটি অ্যাপ ব্যবহার করছি না; আমাদের প্রতিটি ডিজিটাল কার্যক্রমও একটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ হয়ে যাচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রযুক্তি আমাদের শত্রু। বরং প্রযুক্তি আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন। শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, ব্যবসা, যোগাযোগ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তাই প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান নয়, বরং সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহারই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

প্রথমত, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক তথ্য, ওটিপি কিংবা সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে কোথাও শেয়ার করা উচিত নয়। কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার আগে সেটি কী ধরনের অনুমতি চাইছে, তা খেয়াল করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। মানুষকে জানতে হবে কীভাবে অ্যালগরিদম কাজ করে, কীভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ায়, কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং কীভাবে নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি নাগরিক সচেতনতারও অংশ। তৃতীয়ত, আমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল উদ্যোগকে আরও বেশি সমর্থন করতে হবে। দেশীয় কনটেন্ট নির্মাতা, গবেষক, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা গেলে ডিজিটাল নির্ভরতার পরিবর্তে ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, আজকের পৃথিবীতে সার্বভৌমত্ব শুধু ভৌগোলিক সীমারেখার প্রশ্ন নয়; এটি তথ্য, প্রযুক্তি এবং মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যে সমাজ নিজের তথ্যের মূল্য বোঝে না, সে সমাজ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

স্মার্টফোন আমাদের হাতে একটি অসাধারণ শক্তি তুলে দিয়েছে। এই শক্তি দিয়ে আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারি, নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারি, আবার অচেতনভাবে নিজের সময়, মনোযোগ ও ব্যক্তিগত তথ্যও অন্যের হাতে তুলে দিতে পারি। তাই এখনই সময় প্রযুক্তিকে সচেতনভাবে ব্যবহার করার, নিজের গোপনীয়তাকে মূল্য দেওয়ার এবং ডিজিটাল যুগে স্বাধীনতার নতুন অর্থ উপলব্ধি করার। কারণ আগামী দিনের পৃথিবীতে শুধু ভূখণ্ড নয়, ডেটাও সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

সিনথিয়া ইসলাম খুশবু

শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়