অবকাঠামো, ভূরাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা
এমএ হোসাইন
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। হরমুজ শুধু তেল পরিবহনের একটি পথ নয়; বরং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি। যখনই যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামুদ্রিক উত্তেজনা দেখা দেয়, তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠে- তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এমন একটি জলপথের উপর নির্ভরশীল, যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই এবং যার কার্যকর বিকল্পও সহজে গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
এই উপলব্ধিই মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন অবকাঠামোগত প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন, রেলপথ ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিপুল বিনিয়োগ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজের বাইরে অবস্থিত বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং নতুন রপ্তানি পাইপলাইন নির্মাণ করছে। অন্যদিকে ওমান নিজেকে আরব সাগরকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা একটি বিকল্প বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। কাগজে-কলমে এসব প্রকল্প অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে এগুলো আরও গভীর একটি সত্য তুলে ধরে- অবকাঠামো যতই উন্নত হোক, ভূগোলকে পুরোপুরি পরাজিত করা যায় না। ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। প্রতিটি পরাশক্তিই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথের উপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সুয়েজ খালকে রক্ষা করেছিল, কারণ তাদের বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই পথ। যুক্তরাষ্ট্র পানামা খালে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করেছে। আজ চীনও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, যার অন্যতম উদ্দেশ্য মালাক্কা প্রণালীর উপর নির্ভরতা কমানো। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোও সেই একই ঐতিহাসিক ধারার অনুসারী। তারা ঝুঁকি দূর করতে নয়, বরং ঝুঁকিকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দিতে চাইছে। এই তাগিদের কারণও অত্যন্ত বাস্তব। বিশ্বে সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার প্রায় পুরোপুরি এই পথের উপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক, বাহরাইন এবং ইরানও একইভাবে এর উপর নির্ভরশীল। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ অচল হয়ে গেলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, খাদ্য, ওষুধ, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
ভৌগোলিক সুবিধার দিক থেকে সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু পর্যন্ত বিস্তৃত পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন হরমুজ এড়িয়ে সরাসরি তেল রপ্তানির সুযোগ দেয়। ভিশন-২০৩০ কর্মসূচির আওতায় রিয়াদ এখন নতুন পাইপলাইন, মহাসড়ক, রেলপথ এবং লজিস্টিক হাব নির্মাণে আরও গতি এনেছে। এগুলো শুধু অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের প্রকল্প নয়; বরং ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে এক ধরনের নিরাপত্তা বিমা। সংযুক্ত আরব আমিরাতও ভিন্ন কিন্তু বাস্তবসম্মত পথ বেছে নিয়েছে। দুবাইয়ের জেবেল আলি ও আবুধাবির খলিফা বন্দর উপসাগরের ভেতরে হওয়ায় সংকটের ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু ফুজাইরাহ ও খোর ফাক্কান বন্দর হরমুজের বাইরে ওমান উপসাগরে অবস্থিত হওয়ায় এগুলো কৌশলগত বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফুজাইরাহমুখী পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়ানো হলে সামুদ্রিক সংকটকালেও দেশটির তেল রপ্তানি অনেকাংশে অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। তবে এখানেও ভূগোল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হাজর পর্বতমালা পূর্ব উপকূলকে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, ফলে পরিবহন ব্যয় ও সময়- দুটিই বেড়ে যায়। ওমানের অবস্থান আরও ব্যতিক্রমী। দেশটি হরমুজের উপর নির্ভর না করেই সরাসরি আরব সাগরে প্রবেশাধিকার ভোগ করে। দুকম, সোহার, সালালাহ ও মাসকাট বন্দর ধীরে ধীরে আঞ্চলিক বাণিজ্যের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। বিশেষ করে দুকম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করে শিল্প ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কৌশলগত অবস্থান থাকলেও সৌদি আরব বা আমিরাতের মতো বিপুল আর্থিক সামর্থ্য ওমানের নেই। তবে মূল প্রশ্ন থেকে যায়- এসব প্রকল্প কি সত্যিই হরমুজের বিকল্প হতে পারবে? সম্ভবত উত্তর হলো, না। কারণ পাইপলাইন নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্য পরিবহন করতে পারে। রেলপথ কিংবা মহাসড়ক কখনোই সমুদ্রপথের বিশাল পরিবহন সক্ষমতার সমতুল্য হতে পারে না। ঘোষিত সব প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হলেও হরমুজ দিয়ে যে পরিমাণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে, তার পুরোটা বহন করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করলেও ভূগোলের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা যায় না।
এর চেয়েও বড় একটি বাধা হলো রাজনীতি। উপসাগরীয় দেশগুলো আঞ্চলিক সংহতির কথা বললেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে জিসিসি থাকলেও প্রকৃত অর্থনৈতিক একীকরণ এখনও অসম্পূর্ণ। অভিন্ন মুদ্রার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। শুল্ক ব্যবস্থায় ব্যতিক্রম রয়ে গেছে। নিরাপত্তা সহযোগিতাও অনেক সময় জাতীয় স্বার্থের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের কাতার অবরোধ দেখিয়ে দিয়েছিল যে অবকাঠামোও রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। একই আঞ্চলিক জোটের সদস্য হয়েও দেশগুলোর মধ্যে হঠাৎ করে আকাশপথ, স্থলসীমান্ত ও নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতা বিশেষ করে কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত চিন্তাধারায় বড় পরিবর্তন আনে। কারণ প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড অতিক্রমকারী পাইপলাইন বা রেলপথ একদিকে যেমন হরমুজের উপর নির্ভরতা কমায়, অন্যদিকে তেমনি নতুন রাজনৈতিক নির্ভরতারও জন্ম দেয়।
ইউরোপের রাশিয়ান জ্বালানির উপর নির্ভরতার অভিজ্ঞতাও একই সতর্কবার্তা দেয়। বহু বছর ধরে এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও ইউক্রেন যুদ্ধের পর সেই পারস্পরিক নির্ভরতা রাজনৈতিক চাপের অস্ত্রে পরিণত হয়। উপসাগরীয় দেশগুলোও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তাই তারা শুধু ভৌগোলিক নয়, রাজনৈতিক ঝুঁকিও কমাতে চায়।
এ কারণেই বহুজাতিক করিডরের তুলনায় জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে চলছে। সৌদি আরব নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমিরাতও একই পথ অনুসরণ করছে। ওমান মনোযোগ দিচ্ছে নিজস্ব বন্দর উন্নয়নে। বিপরীতে ইরাক, তুরস্ক, জর্ডান কিংবা ভারতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী বৃহৎ আঞ্চলিক করিডরগুলো কৌশলগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও রাজনৈতিকভাবে এখনও অনিশ্চিত। ইরাক-তুরস্ক লজিস্টিক করিডর তারই উদাহরণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় দেশগুলো ইউরোপে সরাসরি স্থলপথে পণ্য পাঠানোর সুযোগ পাবে। কিন্তু ইরাকের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব এই পরিকল্পনার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। একইভাবে ঐতিহাসিক হেজাজ রেলপথ পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাবও কল্পনাকে উসকে দেয়। একসময় ইস্তাম্বুল থেকে পবিত্র নগরীগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী এই রেলপথ আঞ্চলিক সংযোগের প্রতীক ছিল। কিন্তু ভিন্ন রেলগেজ, পুরোনো অবকাঠামো, বিপুল অর্থায়নের প্রয়োজন এবং সীমিত বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এ উদ্যোগকে কঠিন করে তুলেছে।
প্রযুক্তিও ভূগোলকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে না। ভারত-আমিরাত সমুদ্রতল পাইপলাইন কিংবা ভূমধ্যসাগরমুখী রপ্তানি করিডরের মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলোও রাজনৈতিক মতবিরোধ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতা শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের নয়; পুরো বিশ্বের জন্যই প্রযোজ্য। আধুনিক বিশ্বায়নের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে অল্প কয়েকটি কৌশলগত সামুদ্রিক পথের ওপর- হরমুজ, বাব আল-মান্দেব, সুয়েজ খাল, পানামা খাল এবং মালাক্কা প্রণালী। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা ততই জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি কৌশলগত অপরিহার্যতা।
সুতরাং উপসাগরীয় অঞ্চলের এই অবকাঠামো বিপ্লবকে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার এক বাস্তববাদী কৌশল। পাইপলাইন, বন্দর, রেলপথ কিংবা লজিস্টিক করিডর কখনোই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রবেশদ্বারটির বিকল্প হতে পারবে না। তবে এগুলো সংকটের সময় সরকারগুলোকে মূল্যবান কৌশলগত নমনীয়তা প্রদান করতে পারে।
সবশেষে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই- ভূগোলই এখনও ভূরাজনীতির প্রথম খসড়া লিখে দেয়। অর্থ বিকল্প সৃষ্টি করতে পারে, প্রযুক্তি দক্ষতা বাড়াতে পারে, কূটনীতি উত্তেজনা কমাতে পারে।
কিন্তু মানচিত্রের বাস্তবতাকে তারা কেউই বদলে দিতে পারে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামো বিপ্লব তাই ইরানের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত জয় কিংবা হরমুজ থেকে স্থায়ী মুক্তির কৌশল নয়; বরং ভবিষ্যতের অনিবার্য সংকটের আগে সময় কেনা, ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া এবং অর্থনৈতিক টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ানোর এক সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রনৈতিক বিনিয়োগ।
এমএ হোসাইন
রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
