বন্যার আগ্রাসনে বিপন্ন জনপদ
আমানুর রহমান
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্বের সামনে এক রূঢ় বাস্তবতা। মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে। জাতিসংঘের আইপিসিসির ২০১৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুঞ্জীভূত গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। শতাব্দীর শেষ নাগাদ এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া বর্তমান হারে অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ উদ্ভিদ ও প্রাণী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই বৈশ্বিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে চরম বিপন্নতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই বদ্বীপের বুক চিরে হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মতো নদ-নদীগুলো সাগরে পতিত হয়েছে। উর্বর পলিমাটিতে গঠিত এই ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক আশীর্বাদই আজ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের ঋতুবৈচিত্র্য ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্র আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত।
ইউএনডিপির তথ্যমতে, ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল ০.৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু ১৯৬১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির গড় হার দাঁড়ায় ০.৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, অর্থাৎ আগের গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি, ২০৫০ সালে ১.৪ ডিগ্রি এবং ২১০০ সাল নাগাদ কমপক্ষে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে শীতকালের স্থায়িত্ব কমে গ্রীষ্মের উষ্ণতা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে। পাশাপাশি দেশের বৃষ্টিপাতের ধরনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১০ সালে দেশে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, তা ছিল ১৯৯৪ সালের পর সর্বনিম্ন। বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি ও সুষম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে গিয়ে অল্প সময়ে অতিমাত্রায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা নদ-নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহকে ব্যাহত করছে। অন্যদিকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সমুদ্রের লোনা পানি দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মাধ্যমে, যা উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর মানচিত্রই বদলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আইপিসিসির পঞ্চম মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটারেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষের আবাসভূমি ও কৃষিজমি সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ, দেশের আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা সমুদ্রের আগ্রাসনে বিলীন হয়ে যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা এবং ঘন ঘন আঘাত হানার প্রবণতাও বাড়ছে।
২০১১ সালে ইউএনডিপি ও ম্যাপলক্রাফটের সমীক্ষায় দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ পাঁচটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। বঙ্গোপসাগরের ত্রিভুজাকৃতির গাঙ্গেয় মোহনার কারণে সমুদ্রের মহীঢাল ক্রমশ নিচের দিকে নেমে গেছে। এই ভৌগোলিক কাঠামোর কারণে আন্দামান সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলো উপকূলের দিকে ধেয়ে এলে জলোচ্ছ্বাস প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে। সমুদ্রের এই আগ্রাসী রূপ শুধু আমাদের ভূখণ্ডকেই গ্রাস করছে না, বরং উপকূলীয় কোটি মানুষের বাঁচার অধিকারকে এক অসম যুদ্ধের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক রূপ নেয় বন্যা। স্বাধীনতার পর ১৯৮৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ এবং ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী বন্যা জনজীবনে গভীর ক্ষত রেখে গেছে।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮৭ সালের বন্যায় দেশের ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়, প্রাণ হারান ২ হাজার ৫৫ জন এবং আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের। ১৯৮৮ সালের বন্যাটি ছিল এ দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয়। ওই বন্যায় প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১.২ বিলিয়ন ডলারে এবং প্রাণ হারান কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ। ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী মহাবন্যায় দেশের প্রায় এক লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়; তিন কোটি মানুষ গৃহহীন হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ২০০৪ সালের বন্যায় ৭০০ মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি ক্ষতি হয় ২ বিলিয়ন ডলারের। এরপর ২০০৭ সালের বন্যাতেও ৩২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়ে ৬৪৯ জনের প্রাণহানি ও ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক শতাব্দীতে গড়ে প্রতি ছয় বছর অন্তর এ দেশে বড় ধরনের বন্যা আঘাত হেনেছে। বন্যা তাই আজ নিছক কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের এক গভীর সংকট। বন্যার এই নিষ্ঠুর থাবা মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও কৃষিব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু নদীভাঙন ও বন্যার কারণেই বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫৪০ কোটি ডলার বা ৪৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৫ লাখ হেক্টর আবাদি জমি দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। অসময়ের বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে প্রধান ফসল ধানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পাটের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় কৃষকেরা পাট চাষে বিমুখ হয়ে পড়ছেন।
অন্যদিকে শীতকালের স্বাভাবিক স্থায়িত্ব কমে যাওয়ায় সরিষা, মসুর ও ছোলার মতো রবিশস্যের উৎপাদনও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৮৮ সালের বন্যার হিসাব থেকে দেখা যায়, শুধু কৃষি খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং বাসস্থান ও সেবা খাতে ক্ষতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা। একইভাবে ২০০৪ ও ২০০৭ সালেও কৃষির পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভৌতকাঠামো ও শিল্প খাতে বিপুল অর্থনৈতিক ধস নামে।
কৃষি খাতের এই অব্যাহত ধ্বংসযজ্ঞ ও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণে জাতীয় অর্থনীতি যে গভীর খাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আগামী দিনে এক দুরূহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে হলে বন্যার অন্তর্নিহিত কারণগুলো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনুধাবন করা এবং তা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য। বাংলাদেশে বন্যা সৃষ্টির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এর নিম্ন ভূসংস্থান, উজানে ও দেশের অভ্যন্তরে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, হিমালয়ের বরফ গলন, নদ-নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং সামুদ্রিক জোয়ার-ভাটার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার চরম ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের ১২টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা ও খরা আজ আমাদের জাতীয় জীবনের এক নিয়মিত সংকটে পরিণত হয়েছে। এই দুর্যোগ ও জাতীয় ক্ষতি প্রশমনের জন্য বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে নদ-নদী ও খালগুলোর নিয়মিত খনন (ড্রেজিং), অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নিচু জমি ভরাট রোধ করে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা এবং বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে বহুতল আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের স্রোতকে হয়তো রাতারাতি থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এই বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়াই করে একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সম্ভব।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ
