প্লাস্টিকের মহামারি : সুবিধার আড়ালে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের নীরব বিপর্যয়

জাকিয়া সুলতানা

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দৈনন্দিন জীবনে আমাদের বিভিন্ন কাজে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ছোট একটি প্যাকেটজাত পণ্য কিনতেও আমরা নির্দ্বিধায় পলিথিন ব্যবহার করছি। কাঁচাবাজার, মুদি দোকান থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পলিথিনই যেন এখন নিত্যসঙ্গী। সুবিধার মোড়কে আবৃত এই অভ্যাসই আমাদের এবং পরিবেশের জন্য এক নীরব বিপর্যয়। সচেতনতার অভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটি আজ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে পরিবেশের জন্য অন্যতম ক্ষতিকর উপাদান হলো প্লাস্টিক। একে এক অর্থে ‘জীবন্ত বিষ’ বলা যায়, কারণ প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য পরিবেশে ২০০ থেকে ৫০০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। প্রথম কয়েক দশকে প্লাস্টিক ফটোডিগ্রেডেশন প্রক্রিয়ায় ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, যা মাইক্রোপ্লাস্টিক হিসেবে পরিচিত। সাধারণত ৫ মিলিমিটারের কম আকারের এসব কণা পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যায়। বর্তমানে মাটি, নদী-নালা, জলাশয়, সমুদ্র, লবণ ও বৃষ্টির পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, মানুষের রক্ত, ফুসফুস, মায়ের বুকের দুধ, এমনকি গর্ভফুলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি দূষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবিষ্যৎ তৈরি করছি। ফসলি জমিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক সবজি ও খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে। এর প্রভাব গর্ভবতী মা ও নবজাতকের শরীরেও দেখা যাচ্ছে, যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়ের জন্যই উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি)-এর গবেষক রাহাত মুস্তফা প্রান্ত এবং তার সহকর্মীদের পরিচালিত গবেষণা ‘Pollution to Policy: A Holistic Reviwe of Microplastics in the Environment in Bangladesh’-এ মাইক্রোপ্লাস্টিকের নানা ক্ষতিকর দিক উঠে এসেছে। গবেষণায় দেশের ৬৫টি স্থানের মাটি, পানি ও জলজ প্রাণীর দেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের পরিবেশে সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও পলিপ্রোপিলিন, যা মূলত পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল এবং সিনথেটিক কাপড় থেকে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

গবেষণা অনুযায়ী, পরিবেশে পাওয়া পলিপ্রোপিলিনের একটি বড় অংশ আসে সিনথেটিক ফাইবার থেকে। এসব ফাইবার সিনথেটিক কাপড় ও তার বর্জ্য থেকে উৎপন্ন হয়। কাপড় ধোয়ার সময় অসংখ্য ক্ষুদ্র ফাইবার পানির সঙ্গে মিশে নদী-নালা ও জলাশয়ে প্রবেশ করে। ফাস্ট ফ্যাশনের যুগে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা অজান্তেই পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছি। পোশাক কেনার সময় আমরা খুব কমই ভাবি যে কাপড়টি কী ধরনের ফাইবার দিয়ে তৈরি এবং ব্যবহারের পর তা পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে। আমাদের অসচেতন জীবনযাপন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দূষিত পরিবেশ রেখে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পলিপ্রোপিলিন পোড়ালে কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস উৎপন্ন হয়। এসব বিষাক্ত উপাদান মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য মানুষ ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই হুমকি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ।

ফলে প্লাস্টিকের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে সরকার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং পাটজাত পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করে। তবে বাস্তবে এখনও বাজার, মুদি দোকান ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্লাস্টিকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে চলমান। বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প ও পাটশিল্পের বিকাশ এই সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সুতি কাপড়, পাটের ব্যাগ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে। দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করতে আমরা প্লাস্টিক ব্যবহার করছি, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ফল ভোগ করতে হবে আগামী প্রজন্মকে। তাই আমাদের ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনই পারে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। বাজার থেকে একটি বা দুটি প্যাকেটজাত পণ্য কিনলেও সাধারণত পলিথিনে দেওয়া হয়। এই অপ্রয়োজনীয় পলিথিন ব্যবহারে আমাদের ‘না’ বলতে হবে।

কাঁচাবাজার কিংবা অন্যান্য কেনাকাটার সময় নিজস্ব কাপড় বা পাটের ব্যাগ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (রিসাইক্লিং) বৃদ্ধি করলে পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্লাস্টিক বর্জ্য ও সাধারণ আবর্জনা আলাদাভাবে সংগ্রহের জন্য পৃথক ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি এবং এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে।

বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন এবং সেগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এই ক্ষেত্রে প্রশাসন ও সাধারণ জনগণ উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে। সর্বোপরি, আমাদের সাধারণ অভ্যাসের পরিবর্তনই পারে আজকের ও আগামীর বাংলাদেশকে প্লাস্টিক দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে। সচেতনতা শুরু হোক নিজের ঘর থেকে। তাহলেই সম্ভব হবে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলা।

জাকিয়া সুলতানা

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ