বিশ্বমানের আবহাওয়া অধিদপ্তর গড়ার এখনই সময়

জুবাইয়া বিন্তে কবির

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি যেমন অপার সম্ভাবনার, তেমনি নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার বিশাল বদ্বীপে গড়ে ওঠা এই দেশটি একদিকে উর্বর ভূমির আশীর্বাদ পেয়েছে, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, বজ্রপাত, কালবৈশাখি, নদীভাঙন ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নিয়তি হিসেবে বহন করে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সেই ঝুঁকি আজ আরও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কোটি মানুষের জীবন রক্ষার অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। একটি নির্ভুল পূর্বাভাস কখনও কখনও হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। কয়েক ঘণ্টা আগেই যদি উপকূলের মানুষ জানতে পারেন যে একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে যাচ্ছে, তবে তারা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারবেন, জেলেরা নিরাপদে ফিরতে পারবেন, কৃষক ফসল রক্ষা করতে পারবেন এবং প্রশাসন আগাম প্রস্তুতি নিতে পারবে। অর্থাৎ একটি আধুনিক আবহাওয়া ব্যবস্থা শুধু তথ্য দেয় না, জীবন বাঁচায়। কার্যত পঙ্গু আবহাওয়া অধিদপ্তর : দুঃখজনক হলেও সত্য, দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর এখনও বহু ক্ষেত্রে কয়েক দশক আগের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ ডপলার রাডার অচল, বজ্রপাত শনাক্তকারী সেন্সরের বড় অংশ বিকল, নিজস্ব আবহাওয়া উপগ্রহ নেই, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার নেই, এমনকি পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত আবহাওয়াবিদ ও প্রকৌশলীও নেই। ফলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে বিদেশি সংস্থার তথ্য এবং সীমিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করেই পূর্বাভাস দিতে হচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নয়; এটি রাষ্ট্রের দুর্যোগব্যবস্থাপনার একটি বড় ঝুঁকি। বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, দীর্ঘ খরা এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা আগের তুলনায় বেড়েছে। আগে যে আবহাওয়ার ধরণ কয়েক দিনে পরিবর্তিত হতো, এখন তা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে যেতে পারে। এই বাস্তবতায় পুরোনো অ্যানালগ প্রযুক্তি দিয়ে আধুনিক দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার, রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট তথ্য, উন্নত ডপলার রাডার এবং স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই উপলব্ধি করেছে যে, আবহাওয়া পূর্বাভাসে বিনিয়োগ মানে মানুষের জীবন ও অর্থনীতি রক্ষায় বিনিয়োগ। জাপান পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। তবুও সেখানে শক্তিশালী আবহাওয়া সংস্থা, নিজস্ব আবহাওয়া উপগ্রহ, শতাধিক আধুনিক ডপলার রাডার, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার কারণে ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প-পরবর্তী সুনামি কিংবা ভারী বৃষ্টিপাতের আগাম সতর্কতা অত্যন্ত দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের National Weather Service Ges NOAA বিশ্বের অন্যতম উন্নত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পরিচালনা করে। শত শত রাডার, একাধিক আবহাওয়া উপগ্রহ, সমুদ্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমে তারা কয়েক দিন আগেই সম্ভাব্য ঝড়ের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। ফলে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়।

বাংলাদেশ প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বজ্রপাত ও নদীভাঙনে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখোমুখি হয়। কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—প্রতিটি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ আধুনিক আবহাওয়া প্রযুক্তিতে তুলনামূলক সীমিত বিনিয়োগের মাধ্যমে এই ক্ষতির বড় অংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। সুতরাং আবহাওয়া অধিদপ্তরকে একটি সাধারণ সরকারি দপ্তর হিসেবে নয়; বরং জাতীয় দুর্যোগ নিরাপত্তার অন্যতম কৌশলগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। কারণ একটি নির্ভুল পূর্বাভাস শুধু আবহাওয়ার খবর নয়- এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম রক্ষাকবচ।

দুর্যোগ মোকাবিলায় জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম সফল রাষ্ট্র। কারণ দেশটি কখনও দুর্যোগকে পুরোপুরি ঠেকানোর দাবি করেনি; বরং প্রযুক্তি, গবেষণা এবং দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। জাপান আবহাওয়া সংস্থা (JMA) নিজস্ব আবহাওয়া উপগ্রহ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার, শতাধিক ডপলার রাডার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে সারা দেশে সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষম। মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাইরেন- সব মাধ্যম একযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য উন্নত দেশও একই পথ অনুসরণ করেছে। সেখানে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ শুধু একটি সরকারি দপ্তরের কাজ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে তারা প্রতিবছর বিপুল বিনিয়োগ করে। কারণ তারা জানে, দুর্যোগের আগে সতর্কতা দেওয়া দুর্যোগের পরে পুনর্গঠনের চেয়ে অনেক কম ব্যয়বহুল এবং বহুগুণ কার্যকর। বর্তমান বিশ্বের আবহাওয়া পূর্বাভাস মূলত তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—আবহাওয়া উপগ্রহ, ডপলার রাডার এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার।

স্যাটেলাইট মহাকাশ থেকে মেঘের সৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে। ডপলার রাডার স্থানীয়ভাবে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও বাতাসের বেগ নির্ণয় করে। অন্যদিকে সুপারকম্পিউটার প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য আবহাওয়ার মডেল তৈরি করে। বাংলাদেশে এই তিনটি ব্যবস্থার কোনোটিই আন্তর্জাতিক মানে গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেক সময় পূর্বাভাস দিতে বিলম্ব হয়, আবার কোথাও কোথাও পূর্বাভাসের নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এমন সীমাবদ্ধতা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।

শুধু উন্নত যন্ত্রপাতি কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ আবহাওয়াবিদ, প্রকৌশলী, তথ্যবিশ্লেষক, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকও প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের অনেক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সীমিত জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও একজন, কোথাও দুজন কর্মকর্তা পুরো দায়িত্ব পালন করছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা সহযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আবহাওয়া বিজ্ঞান ও জলবায়ুবিষয়ক উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ জরুরি।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশকেও একই পথ অনুসরণ করতে হবে। কারণ দক্ষ মানুষই প্রযুক্তিকে কার্যকর করে তোলে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষকের বীজ বপন, সেচ, সার প্রয়োগ কিংবা ফসল কাটার সময় নির্ধারণে নির্ভুল আবহাওয়া তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বঙ্গোপসাগরে হাজার হাজার জেলে প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে যান। সামান্য বিলম্বে দেওয়া সতর্কবার্তাও শত শত প্রাণহানির কারণ হতে পারে। বিমান চলাচল, নৌপরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নির্মাণশিল্প, পর্যটন এমনকি নগর ব্যবস্থাপনাও এখন আবহাওয়া তথ্যনির্ভর।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট