মূল্যস্ফীতি কমেছে, কমেনি মানুষের দীর্ঘশ্বাস

মো. রেজাউল করিম রনি

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অর্থনীতি নিয়ে যখনই আলোচনা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি। সরকারি ঘোষণা আসে, মূল্যস্ফীতির হার আগের মাসের তুলনায় কমেছে। সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয় মূল্যস্ফীতি কমেছে অর্থনীতিতে স্বস্তির আভাস দাম বৃদ্ধির চাপ কমছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের কোনো বাজারে ঢুকলেই দেখা যায় ভিন্ন এক বাস্তবতা। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, ডিম, সবজি কিংবা শিশুখাদ্য সবকিছুর দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। মধ্যবিত্ত সংসারের মাসিক হিসাব প্রতিনিয়ত এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, নিম্ন আয়ের মানুষ প্রতিদিন লড়াই করছে ন্যূনতম খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য।

তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যদি মূল্যস্ফীতি কমেই থাকে, তবে মানুষের কষ্ট কমছে না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে নয়, বরং বাজারের প্রতিটি দোকানে, প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে এবং প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। অনেকেই মনে করেন, মূল্যস্ফীতি কমা মানেই পণ্যের দাম কমে যাওয়া। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই তা নয়। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ হলো পণ্যের দাম আগের মতো দ্রুত বাড়ছে না। অর্থাৎ দাম এখনও বাড়ছে, শুধু বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। তাই মানুষ যে দামে পণ্য কিনছিল, তার চেয়ে কম দামে কেনার সুযোগ তৈরি হয়নি।

ধরা যাক, এক বছর আগে পাঁচ কেজি চাল কিনতে একজন মানুষের খরচ হতো ৩০০ টাকা। পরে সেটি বেড়ে ৩৬০ টাকা হলো। পরবর্তী বছরে সেই দাম বেড়ে দাঁড়াল ৩৮০ টাকা। অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতির হার কমেছে, কারণ দাম বাড়ার হার আগের তুলনায় কম। কিন্তু বাস্তবে ভোক্তাকে এখনও ৩৮০ টাকাই ব্যয় করতে হচ্ছে। তাই মানুষের কষ্ট কমে না।

আরও বড় সমস্যা হলো মানুষের আয়। দেশের অধিকাংশ চাকরিজীবী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা কৃষকের আয় যে হারে বাড়ছে, নিত্যপণ্যের দাম তার চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। অর্থনীতিতে এটিকে বলা হয় Real Income Erosion বা প্রকৃত আয়ের ক্ষয়। বেতন কিছুটা বাড়লেও বাজারে গিয়ে সেই বেতনের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। এই কারণেই আজ বহু পরিবার আগের মতো মাছ-মাংস কিনতে পারে না, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়, চিকিৎসা পিছিয়ে দেয় এবং সঞ্চয়ের কথা প্রায় ভুলেই গেছে।

বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থার আরেকটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো মূল্য হ্রাসের ধীরগতি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, ভোজ্যতেল কিংবা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে খুব দ্রুত তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়ে। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলেও সেই সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। এর পেছনে রয়েছে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়, অস্বচ্ছ বাজার কাঠামো, মজুতদারি এবং অসাধু ব্যবসায়িক প্রবণতা। ফলে একবার যে দাম বাড়ে, সেটি সহজে আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।

মূল্যস্ফীতির আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনযাত্রার মানের ওপর। একটি পরিবার যখন মাসের শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারে না, তখন তারা প্রথমেই পুষ্টিকর খাবারের ব্যয় কমায়। এরপর চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক, এমনকি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও কমিয়ে দেয়। এই সংকোচন শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয় এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তাদের আয়ের অধিকাংশই ব্যয় হয় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে। ফলে বাজারে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের জীবনে বড় ধরনের সংকট তৈরি করে। অনেকেই এখন ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন, কেউ কেউ সঞ্চয় ভেঙে খরচ করছেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।

অন্যদিকে উৎপাদকরাও স্বস্তিতে নেই। কৃষক উৎপাদনের সময় সার, বীজ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ বহন করছেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানি ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে মূল্যস্ফীতি শুধু ভোক্তার সমস্যা নয় এটি পুরো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

অর্থনীতির পরিসংখ্যান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই পরিসংখ্যান তখনই অর্থবহ, যখন তার সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়। মানুষের আয় যদি না বাড়ে, বাজার যদি সুশাসনের আওতায় না আসে, সরবরাহব্যবস্থা যদি শক্তিশালী না হয় এবং বাজারে অসাধু কারসাজি যদি বন্ধ না হয়, তাহলে শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমার ঘোষণা মানুষের জন্য কোনো বাস্তব স্বস্তি বয়ে আনবে না।

এখন প্রয়োজন বাস্তবমুখী নীতিগত উদ্যোগ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা আধুনিক করা, বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা এবং কর্মসংস্থান ও প্রকৃত আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা এবং সরকারের দায়িত্ব হবে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট অর্থনীতির সফলতা শুধু কাগজের গ্রাফে নয়, মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হতে হবে। যে দিন একজন নিম্ন আয়ের মানুষ বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন, একজন মধ্যবিত্ত বাবা-মা সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না, এবং একটি পরিবার ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারবে সেদিনই বলা যাবে, মূল্যস্ফীতি সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য পরিসংখ্যানকে সুন্দর দেখানো নয় মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করা। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড জিডিপির সংখ্যা নয়, বরং সাধারণ মানুষের মুখের হাসি, তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার স্বস্তিই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রগতির পরিচয়।

মো. রেজাউল করিম রনি

সাবেক শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট