তাকফিরের অপব্যবহার : মুসলিম সমাজের এক নীরব সংকট
মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান সময়ে মুসলিম সমাজের একটি অংশের উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো- সামান্য মতভেদ, রাজনৈতিক অবস্থান, ফিকহি মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে একে অপরকে ‘কাফের’, ‘মুরতাদ’ কিংবা ‘মুনাফিক’ বলে আখ্যায়িত করা। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের ফলে এই প্রবণতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। অথচ ইসলামে কাউকে কাফের ঘোষণা করা (তাকফির) অত্যন্ত গুরুতর শরয়ি বিষয়, যা কোনো সাধারণ মানুষের আবেগ, রাগ বা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়। ‘তাকফির’ অর্থ হলো- কোনো মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে বলে ঘোষণা করা। এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যার সঙ্গে একজন মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত-সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ বিধান জড়িত। তাই ইসলামী শরিয়তে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহতায়ালা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে বের হও, তখন ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করো। যে ব্যক্তি তোমাদের সালাম দেয়, তাকে পার্থিব জীবনের সম্পদের লোভে ‘তুমি মুমিন নও’ বলো না।’ (সুরা আন-নিসা, ৪:৯৪)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশকারী কাউকে তার সাধারণ ও ছোটখাটো বিষয়ে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করার গোষণা দেয়া কোনক্রমেই বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি তার ভাইকে ‘হে কাফের’ বলে, তাহলে এ কথা তাদের একজনের ওপর অবশ্যই বর্তাবে। যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি বাস্তবেই তেমন না হয়, তবে সেই কথা অভিযুক্তকারীর দিকেই ফিরে যাবে।’ (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬১০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬০)
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন- ‘কোনো মানুষ যদি আরেকজনকে ফাসিক বা কাফের বলে, অথচ সে তেমন না হয়, তবে সেই অপবাদ তার নিজের ওপর ফিরে আসে।’ (সহিহ আল-বুখারি)
এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কাউকে কাফের বলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়।
আকিদাগত কুফর ও নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাকফির এক বিষয় নয়। আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি বর্ণনা করেছেন- ‘কোনো বক্তব্য বা কাজ কুফরি হওয়া এবং সেই বক্তব্য প্রদানকারী নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফের ঘোষণা করা- এ দুটি এক বিষয় নয়।’ অর্থাৎ, কোনো মতবাদ বা বক্তব্য ইসলামের দৃষ্টিতে কুফরি হতে পারে; কিন্তু সেই মত পোষণকারী ব্যক্তিকে কাফের ঘোষণা করার আগে বহু বিষয় যাচাই করতে হয়। যেমন-
তিনি বিষয়টি জানতেন কি না, তার কাছে সঠিক দলিল পৌঁছেছিল কি না, তিনি ভুল ব্যাখ্যার শিকার হয়েছেন কি না, জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা ছিল কি না, তার বক্তব্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, এসব বিবেচনা না করে ব্যক্তিকে কাফের বলা ইসলামি ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। আহলুস সুন্নাহর বিশিষ্ট ইমামগণ তাকফিরের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংযমী ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নিকট থেকে বর্ণিত নীতিতে দেখা যায়, কিবলামুখী মুসলিমকে শুধু গুনাহ বা মতভেদের কারণে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া যাবে না।
ইমাম নববী (রহ.) লিখেছেন, একজন মুসলিমকে কাফের ঘোষণা করার আগে নিশ্চিত প্রমাণ থাকতে হবে; সন্দেহ থাকলে তাকফীর থেকে বিরত থাকাই শরিয়তের নীতি। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বহু স্থানে উল্লেখ করেছেন যে, নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর তাকফির আরোপের আগে শরয়ি শর্ত পূরণ এবং প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়া অপরিহার্য।
ইসলামের ইতিহাসে খারিজিরা বড় গুনাহ বা মতভেদের কারণে মুসলিমদের কাফের ঘোষণা করত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন এবং তাদের চিন্তাধারাকে মুসলিম উম্মাহর জন্য বিপজ্জনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, অযথা তাকফিরের প্রবণতা ইসলামের মূলধারার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য ফিকহি মতভেদ হয়েছে। চার ইমামের মধ্যে বহু মাসয়ালায় মতপার্থক্য ছিল। আকিদার বহু সূক্ষ্ম বিষয়ে আলেমদের আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়েও মতভেদ ছিল। কিন্তু এসব মতপার্থক্য কাউকে সহজে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়ার কারণ হয়ে ওঠেনি।
আজ ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য মাধ্যমে ইসলামি জ্ঞানের পর্যাপ্ত ভিত্তি ছাড়াই অনেকে তাকফিরের ভাষা ব্যবহার করছেন। এর ফলে: মুসলিম সমাজে বিভক্তি বাড়ছে। পারস্পরিক ঘৃণা সৃষ্টি হচ্ছে। সহিংসতা ও উগ্রবাদ উৎসাহিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত হচ্ছে। ইসলাম এমন সংস্কৃতিকে সমর্থন করে না।
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয় হলো-
কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে জ্ঞান অর্জন করা।
আলেমদের মতামতকে সম্মান করা।
মতভেদে শালীনতা বজায় রাখা। প্রমাণ ছাড়া কাউকে কাফের, ফাসিক বা মুনাফিক না বলা। নিজের ঈমান, আমল ও চরিত্র সংশোধনে অধিক মনোযোগী হওয়া। ইসলাম ন্যায়বিচার, সংযম ও ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। তাই তাকফিরের মতো গুরুতর বিষয়কে কখনোই আবেগ, দলীয় আনুগত্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কের অস্ত্র বানানো উচিত নয়। কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং আহলুস সুন্নাহর গ্রহণযোগ্য আলেমদের নীতিমালা আমাদের শেখায়—যেখানে সন্দেহ আছে, সেখানে তাকফীর থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।
মুসলিম সমাজের ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান ও ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য রক্ষার স্বার্থে আমাদের উচিত কথায় কথায় ‘কাফের’ ফতোয়া দেওয়ার সংস্কৃতি পরিহার করা। কারণ মানুষের অন্তরের চূড়ান্ত বিচারক একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই।
মো. মুখলেছুর রহমান
লেখক : ইসলামি চিন্তাবিদ ও অর্থনীতিবিদ
