প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ জুলাই, ২০২৬
মায়ার বিয়ের কয়েক মাসের মাথায় তার স্বামী গ্রিসে যাবে বলে বাসা থেকে চলে গেছে। যৌতুকসহ আরও বিভিন্নভাবে টাকা সংগ্রহ করে ফারুক চলে গেছে। যাওয়ার সময় বউকে ঠিকমতো বলেও যায়নি। স্বামী চলে যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতেও মায়ার জায়গা হয়নি। কয়েক মাস হতে চলল, ফারুক গেছে। দুইবার ফোন করেছে মায়াকে। জানিয়েছে, ওর পাসপোর্ট ওর কাছে নেই, ওরা কয়েকজন লিবিয়ায় আছে। ব্যস, এরপর থেকে আর কোনো খবর নেই।
বাংলাদেশ থেকে চোরাই বা অবৈধ পথে বিদেশে, বিশেষ করে ইউরোপে যাওয়ার পথে ডুবে মারা যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিদেশে কাজ করার হাতছানি এ মানুষগুলোকে মরিয়া করে তোলে। একসময় তারা অবৈধ মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে যায়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনের বিভিন্ন বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর কয়েক শ বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর ও অন্যান্য সমুদ্রপথে প্রাণ হারান বা নিখোঁজ হন।
এ এক ভয়ংকর মৃত্যুযাত্রা। বিদেশে এভাবে হারিয়ে যাওয়ার খবর মানুষ শুনছেন, গণমাধ্যমে খবর পাচ্ছেন এবং ইউটিউবে ভিডিও দেখছেন। কিন্তু তবু বাস্তবতাকে মেনে নিচ্ছেন না। তাদের চোখে স্বপ্ন- জীবনকে সুন্দর করার জন্য ইউরোপে যাবেন, কাজ করবেন, টাকা আয় করবেন। এই জন্য দেশের সব জায়গাজমি বিক্রি করে, ধার করে টাকা দালালদের হাতে তুলে দেন।
অধিকাংশ মানুষেরই আর সেই স্বপ্নের দেশে পৌঁছানো হয় না। কেউ পথে মারা যান, কারও জায়গা হয় বিদেশের জেলখানায়, কেউবা দস্যুদের হাতে বন্দী থাকেন, আর কেউ যুদ্ধ করতে রাশিয়ায় বিক্রি হয়ে যান। বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেদিন ভুয়া ভিসা নিয়ে প্রায় ৪০ জন অভিবাসী শ্রমিক বোর্ডিং ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। পরে তারা কীভাবে সেখান থেকে উধাও হয়ে গেলেন, তাও স্পষ্ট নয়। মানবপাচারকারী চক্রগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে কীভাবে অফিসিয়াল অভিবাসন চ্যানেলগুলোকে ব্যবহার করছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
মাত্র কিছুদিন আগের ঘটনা। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অবৈধ পথে দেশ ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে জিম্মি হয়েছেন ছয় যুবক। তাদের মুক্তির জন্য পরিবারের কাছে মোট দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে দালালচক্র। টাকা না পেয়ে যুবকদের ওপর চালানো হচ্ছে অমানুষিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায়ের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভীষিকাময় এসব ভিডিও দেখে অসহায় পরিবারগুলো চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ক্ষুধা, অনাহার ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কমপক্ষে ১৮ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন, যাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এপ্রিলে ভূমধ্যসাগরের লিবিয়া উপকূলের কাছে ১০৫ জন যাত্রী নিয়ে একটি কাঠের নৌকা ডুবে যায়। এতে বাংলাদেশিসহ অন্তত ৭০ জন অভিবাসী নিখোঁজ হন।
এর আগে ২০২৪ সালে এই লিবিয়া উপকূলে ১২১ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত আটজন বাংলাদেশির মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় এবং অনেকে নিখোঁজ রয়ে যান। এ রকম আরও অনেক মৃত্যুর কাহিনি আমরা জানি। এককথায় বলা যায়, এ স্বপ্নযাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। আইওএমের মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে সমুদ্রপথে অভিবাসীদের মৃত্যুর প্রায় ৯৩ শতাংশ ঘটে পানিতে ডুবে এবং বাকি মৃত্যুর কারণ চরম আবহাওয়া ও খাদ্য-পানির অভাব।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারী অবৈধ অভিবাসীদের একটি বড় অংশই বাংলাদেশি নাগরিক, যা এ রুটটিকে বাংলাদেশিদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাদের অনেকেই জেনেশুনে এই পথে পা রাখছেন। হয়তো মায়ার স্বামী ফারুকও এদের মতোই একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষ।
শুধু কি পানিতে ডুবে মৃত্যু? রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রেও নিহত ও আহত হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেক বাংলাদেশি নাগরিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর পক্ষে ‘ভাড়াটে সৈন্য’ হিসেবে জড়িয়ে পড়েছেন। এ পর্যন্ত ড্রোন হামলায় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন এবং একাধিক ব্যক্তি যুদ্ধবন্দীও হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৩৭ জন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এ ভাড়াটে সৈন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশটির অনেক নাগরিক এখনও রাশিয়ার পক্ষে লড়ছেন (বিবিসি বাংলা)। ইউরোপ বা মালয়েশিয়া ছাড়াও মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া হয়ে সাগরপথে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও মানবপাচারের একাধিক পথ রয়েছে। এ ছাড়া কলম্বিয়া ও মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশের অনেকে মারা গেছেন, অনেকে আটকও হয়েছেন। বিষয়টি কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার-বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনেও এসেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ভূমধ্যসাগর এবং স্থলসীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানো ব্যক্তিদের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকা করেছে। ওই তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
ইউরোপ যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বাংলাদেশিদের মৃত্যু এখন আর নতুন খবর নয়। মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে এ ভয়ংকর যাত্রা এবং মৃত্যুর খবর কয়েক বছর ধরে প্রায় নিয়মিত গণমাধ্যমে আসছে। এরপরও পাচারকারীদের প্রলোভন থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিরত করা যাচ্ছে না। চক্রগুলো পাচারের জন্য খুলছে নতুন নতুন পথ।
ভাগ্যান্বেষী এসব মানুষকে বিপজ্জনক পথে নামিয়েছে পাচারকারীরা। ১৫ বছর আগে ঢাকা থেকে আকাশপথে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিয়ে যেত পাচারকারীরা। তখন সাহারা মরুভূমিতে অনেক বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া যেত।
পরবর্তী সময়ে মানবপাচারের নতুন পথ চালু হয় লিবিয়া হয়ে। ২০১৫ সাল থেকে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করে। এমনকি থাইল্যান্ডের জঙ্গলে মালয়েশিয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গণকবর আবিষ্কৃত হওয়ার খবরও পেয়েছি আমরা। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে পিটিয়ে হত্যা করে গণকবরে পুঁতে ফেলা হতো। অভিবাসনের নামে ভিয়েতনামে গিয়ে প্রতারিত হওয়া ও স্বপ্নভঙ্গের কাহিনিও আছে।
বিএমইটি বলছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ১,৪১০ জন বাংলাদেশি অফিসিয়াল ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ব্রাজিলে গেছেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের এই অভিবাসন সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রের উপস্থিতির আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দালালের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে তাদের ৪৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে।
মূল প্রশ্ন হচ্ছে, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে কীভাবে দেশ ছেড়েছেন কর্মীরা? রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রা, দূতাবাস ও বিএমইটি- মানবপাচারের দায় নিতে চায় না। কর্মীরা বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়লে এক সংস্থা আরেক সংস্থার ওপর দায় চাপায়।
যারা অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন, তারা মনে করেন, পররাষ্ট্র ও প্রবাসী মন্ত্রণালয়, রিক্রুটিং এজেন্সি- সবারই দায় আছে। এখনও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সব পক্ষের জবাবদিহি দরকার। ত্রুটিপূর্ণ যাচাই-বাছাই ক্রমাগত আমাদের প্রবাসী কর্মীদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সরকারের বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও হাজার হাজার নাগরিক কেন মানবপাচারের শিকার হচ্ছেন, সাইবার প্রতারণা চক্রে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন কিংবা সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন হচ্ছেন? বাংলাদেশের অফিসিয়াল ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থার মারাত্মক দুর্বলতাগুলো এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তবে কি সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না? চুক্তিপত্র কি যাচাই করা হচ্ছে না? সরকারি ও আইনি নজরদারি কি দুর্বল? দালালচক্রকে কি কঠোর শাস্তি দেওয়া হচ্ছে? যোগাযোগমাধ্যমে এরা প্রচারণা চালাচ্ছে, ভুয়া বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। তাদের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। মানবপাচার ঠেকাতে সরকারের জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ তো দেখছি না।
বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেদিন ভুয়া ভিসা নিয়ে প্রায় ৪০ জন অভিবাসী শ্রমিক বোর্ডিং ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। পরে তারা কীভাবে সেখান থেকে উধাও হয়ে গেলেন, তাও স্পষ্ট নয়। মানবপাচারকারী চক্রগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে কীভাবে অফিসিয়াল অভিবাসন চ্যানেলগুলোকে ব্যবহার করছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
শাহানা হুদা রঞ্জনা
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।