সাইদুর রহমানের নতুন দায়িত্ব জনকূটনীতির নতুন সম্ভাবনা
তরিকুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে গণমাধ্যমণ্ডসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে যখন একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি, নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন, তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিদেশি মিশনের প্রেস উইংয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। সম্প্রতি বাংলাদেশ হাইকমিশন, নয়াদিল্লি, ভারতের মিশনের প্রেস উইংয়ে মিনিস্টার (প্রেস) পদে দৈনিক ইত্তেফাকের রাজনীতি ও নির্বাচনবিষয়ক সম্পাদক এবং সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান সাইদুর রহমানের নিয়োগ সেই অর্থেই একটি আশাব্যঞ্জক ঘটনা।
ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র। দুই দেশের সম্পর্ক শুধু সরকার থেকে সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, পর্যটন এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ। এ বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও কার্যকরভাবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে একজন দক্ষ সংবাদকর্মীর অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাইদুর রহমান দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে দায়িত্বশীল, তথ্যনির্ভর এবং ভারসাম্যপূর্ণ সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়েছেন। রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ে তার বিশ্লেষণী দক্ষতা, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ এবং জাতীয় ইস্যু সম্পর্কে গভীর ধারণা তাকে একজন অভিজ্ঞ গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, জনমত বোঝা এবং জটিল বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপনের যে সক্ষমতা একজন সাংবাদিক অর্জন করেন, তা কূটনৈতিক যোগাযোগেও সমানভাবে কার্যকর।
বর্তমান বিশ্বে কূটনীতি আর কেবল বৈঠক বা চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখন জনকূটনীতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একটি দেশের ভাবমূর্তি গঠন, সঠিক তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুলে ধরা, গুজব বা বিভ্রান্তির জবাব দেওয়া এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রেস উইংয়ের ভূমিকা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ বাস্তবতায় সাইদুর রহমানের মতো একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেই মনে করা যায়।
আমি একজন সংবাদকর্মী ও সাতক্ষীরার সন্তান হিসেবে বলতে পারি, সাতক্ষীরার মানুষের জন্যও এটি গর্বের একটি সংবাদ। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সাতক্ষীরার বহু কৃতী সন্তান দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের এ সাফল্য নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে এবং জেলার সম্ভাবনাকে নতুনভাবে তুলে ধরে। সাইদুর রহমানের এ অর্জনও সেই ধারাবাহিকতারই একটি উজ্জ্বল সংযোজন।
এমন একটি দায়িত্বে থেকে তিনি চাইলে সাতক্ষীরাসহ দেশের সম্ভাবনাগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও বেশি তুলে ধরতে ভূমিকা রাখতে পারেন। সুন্দরবন, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন এবং সীমান্ত অঞ্চলের উন্নয়ন-এসব বিষয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে। অবশ্যই একজন কূটনীতিক হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের নীতিমালা ও দায়িত্বের আলোকে কাজ করবেন; তবুও তার অভিজ্ঞতা দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সহায়ক হতে পারে।
ভারতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগী, ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের জন্যও একটি কার্যকর প্রেস উইং গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক তথ্য প্রচার, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং ভুল তথ্যের দ্রুত প্রতিকার মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করে।
তথ্যপ্রবাহকে আরও গতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে একজন অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীর ভূমিকা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। কখনো ইতিবাচক সংবাদ, কখনো বিতর্কও সামনে আসে। এমন পরিস্থিতিতে তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল এবং দ্রুত যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। একজন সাংবাদিকের পেশাগত অভিজ্ঞতা এ ধরনের পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। কারণ সংবাদমাধ্যমের ভাষা, জনমতের প্রবণতা এবং তথ্য উপস্থাপনের কৌশল সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সাইদুর রহমানের নিয়োগ তরুণ সাংবাদিকদের কাছেও একটি অনুপ্রেরণার বার্তা বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা একজন সাংবাদিককে শুধু সংবাদপত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগও এনে দিতে পারে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা প্রশাসন ও জনসংযোগকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
একই সঙ্গে এ নিয়োগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় গণমাধ্যম ও কূটনীতির মধ্যে সমন্বয় কতটা প্রয়োজন। বিশ্ব এখন তথ্যের যুগে প্রবেশ করেছে। একটি দেশের ভাবমূর্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে তথ্য উপস্থাপন, যোগাযোগের দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। এই জায়গায় দক্ষ মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় শক্তি।
সাতক্ষীরার মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়োগে আনন্দিত। কারণ একজন মানুষের ব্যক্তিগত সাফল্য তখনই প্রকৃত অর্থে মূল্যবান হয়ে ওঠে, যখন তা সমাজ, অঞ্চল এবং দেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনে। সাইদুর রহমানের এ নতুন দায়িত্বও তেমনই একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তিনি তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ববোধকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস উইংকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করে তুলতে অবদান রাখবেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও ইতিবাচকভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
সাইদুর রহমানের এ অর্জন কেবল একজন ব্যক্তির পদোন্নতি নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের জন্যও একটি সম্মানের বিষয়। সাতক্ষীরার জন্য এটি গর্বের, আর বাংলাদেশের জন্য এটি একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা-যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের মূল্যায়ন একসময় অবশ্যই স্বীকৃতি পায়। তার নতুন দায়িত্ব সফল হোক, দেশের স্বার্থে তাঁর কর্মযাত্রা আরও সমৃদ্ধ হোক-এটাই সবার প্রত্যাশা।
তরিকুল ইসলাম
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
