ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য : সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
সোনিয়া তাসনিম
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির অন্যতম ভূয়সী পরিবর্তন হলো বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু আটলান্টিক অঞ্চল থেকে সরে গিয়ে ধীরে ধীরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়া। বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশ, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগপথ এবং পরাশক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতা আজ মূলত এ অঞ্চল ঘিরেই আবর্তিত। যার দরুন, বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এ বাংলাদেশও তার ভৌগলিক অবস্থানের কারণে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে।
এখন আসা যাক, ইন্দো প্যাসিফিক ধারণা বলতে কী বুঝায়? সাধারণ সংজ্ঞায়, ইন্দো-প্যাসিফিক মূলত একটি উন্মুক্ত, নিরাপদ ও নিয়মভিত্তিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার কথা বললেও মূল রাজনীতিতে এটি শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য চীনের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যে প্রভাব, সেটি মোকাবিলা করার এক বৃহত্তর কৌশল। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’র মাধ্যমে চীন এ অঞ্চলে অবকাঠামো, বন্দর, যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করার চেষ্টা চালাচ্ছে অনেকদিন ধরেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে যেমন বাংলাদেশের ভূ কৌশলগত গুরুত্বকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করছে, তেমনি চীনেরও লক্ষ্য তাদের নেতৃত্বে বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ জিএসআই (Global Security Initiative) ও ডিজিআই (Global Development Initiative) তে বাংলাদেশ যোগ দিক। প্রসঙ্গত, উল্লেখযোগ্য যে, এ ইস্যুতে দুই পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছে। এটিও বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ এ সবকিছুকে পর্যালোচনা করছে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। এ বৃহৎ দুই শক্তির মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান একদিকে যেমন সম্ভাবনার আলো দেখায়, তেমনি অন্যদিকে সংবেদনশীলতার ছায়াটাও ইঙ্গিত করে। খেয়াল করলে দেখা যায়, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ সুগম করেছে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে। চীনের অর্থায়নে পদ্মাসেতুর রেলসংযোগ প্রকল্প, কর্ণফুলীর টানেল, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ একাধিক অবকাঠামো প্রকল্প যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটিও উপেক্ষা করা অসম্ভব যে, বাংলাদেশের বৃহত্তর রপ্তানির বাজার মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আবার অপরপক্ষে ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী হওয়ার সঙ্গে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগের অন্যতম অংশীদার। এদিকে জাপান মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এমন এক ভারসাম্যে এসে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ প্রায় অসম্ভব। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ নিজস্ব ইন্দো প্যাসিফিক আউটলুক ঘোষণার মাধ্যমে যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছিল, তাতে সামরিক জোটের বদলে সমুদ্র নিরাপত্তা, শান্তি, মুক্ত বাণিজ্য, জলবায়ু সহযোগিতা, সংযোগ বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি জোরাল সমর্থন উঠে এসেছে। এটি মূলত বাংলাদেশের সেই সুদীর্ঘকালের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এরই আধুনিক সংস্করণ। এ অবস্থান বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এটি দেশকে কোনো সামরিক ব্লকের অন্তর্ভুক্ত না করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ গ্রহণের পথ সুগম করেছে।
তবে খালি চোখে সমীকরণ যতটা সরল, বাস্তবে ততটা মোটেও নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সময়ের সঙ্গে তীব্র হওয়ার সঙ্গে বিশ্বের ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর ওপর তারা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার ক্রমাগত একটি আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করছে। যা বৈশ্বিক রাজনীতির ভারসাম্যকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করেছে। কোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ভোটদান, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বন্দর ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি অবকাঠামো কিংবা সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ এসব ক্ষেত্রেই এখন বৃহত্তর শক্তিরগুলোর নজরে কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরও বেশি। ভৌগোলিক দিকসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, উন্নয়নের স্বার্থে সব পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা, যা দেশকে একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ে আটকে ফেলবে। দেশের সম্ভাবনার পথকে সংকুচিত করে তুলবে। আর তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পূর্ব ও পশ্চিমের দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশলে বাংলাদেশ আগ্রহী হয়ে উঠছে।
তবে শংকার দোলাচল বিবেচনা পাশে সরিয়ে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও কম নয়। বঙ্গোপসাগর ঘিরে নীল অর্থনীতি, সমুদ্রসম্পদ আহরণ, গভীর সমুদ্রবন্দর, আঞ্চলিক সংযোগ, ডিজিটাল অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সমর্থ হতে সক্ষম। বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রের পুনর্বিন্যাসের ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বর্তমানে চীনের বাইরে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজতে মরিয়া। সেক্ষেত্রে অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে সমর্থ হলে বাংলাদেশ এ সুযোগ অনায়সে কাজে লাগাতে সমর্থ হবে।
আবার এসবকিছুর সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে সমান ভাবে। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জলদস্যুতা, মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, অবৈধভাবে জলজপ্রাণী ধরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর দ্বারা এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য বয়ে আনতে পারে ইতিবাচক ফলাফল। তবে হ্যাঁ, এ সহযোগিতা যেন সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশে না বদলে যায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের হেফাজতের গুরুদায়িত্বটাও ঠিকঠাক পালন করতে হবে। আমাদের কূটনীতির সম্মুখে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থনৈতিক কূটনীতি মজবুত করে তোলা। বিশ্বজুড়ে বিশ্বরাজনীতির এ যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা তাকে সংঘাত হিসেবে নয় বরং বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো জরুরি। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৌশলগত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টি সুনিশ্চিত করাটাও সময়ের দাবি।
বর্তমান বিশ্বে শুধু ভৌগলিক অবস্থানই নয় বরং কূটনৈতিক প্রজ্ঞা একটি রাষ্ট্রের শক্তিকে নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ যদি সেক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ নীতিপরায়ণ স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারে, তাহলে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে সংকটের চাইতে সম্ভাবনাই তৈরি করবে নিশ্চিত। কিন্তু যদি শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে আবেগপ্রসূত হয়ে একপাক্ষিক অবস্থান গ্রহণ করা হয়, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনাই কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রূপান্তরিত হবে।
তাই ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের উচিত কোনো একক শক্তির পক্ষে দাঁড়ানো নয় বরং জাতীয় স্বার্থে সর্বাগ্রে সবার সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বাস্তববাদী কূটনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা। কৌশলগত স্বাধীনতা সমুন্নত রেখে উন্নয়নের যথার্থ সুযোগকে কাজে লাগানোটাই এখন উত্তম সিদ্ধান্ত। এ ভারসাম্য গড়ে তোলা ও রক্ষা করাই আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ উতরে যেতে পারলেই বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয় বরং এই গোটা ইন্দো-প্যাসিফিক পরিমণ্ডলে একটি দায়িত্বশীল নির্ভরযোগ্য ও প্রভাবশালী অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে শতভাগ সফলকাম হবে। আর এই ভারসাম্য রক্ষার কৌশলেই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের আগামীদিনের কূটনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি।
সোনিয়া তাসনিম
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
