সুন্দরবন সুরক্ষায় আমাদের করণীয়

মো. রাকিবুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম একক ম্যানগ্রোভ বন। এটি শুধু একটি বন নয়, বরং বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং উপকূলীয় জনজীবনের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ। জলবায়ু পরিবর্তনের এ সংকটময় সময়ে সুন্দরবনের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেড়েছে। তাই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা মানেই আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের পরিবেশ এবং আমাদের অস্তিত্বকে রক্ষা করা।

প্রায় ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের প্রায় ৬,৫১৭ বর্গকিলোমিটার (প্রায় ৬৬ শতাংশ) বাংলাদেশের মধ্যে এবং অবশিষ্ট প্রায় ৩৪ শতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। বিশ্বের এ অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

প্রতিবছর বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রথম আঘাত নিজের বুকে ধারণ করে সুন্দরবন। সিডর, আইলা, আম্পান, রেমালসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ বন উপকূলীয় অঞ্চলের অসংখ্য মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে সুন্দরবনের অবদান অনস্বীকার্য।

ম্যানগ্রোভ বন পৃথিবীর অন্যতম কার্যকর কার্বন সিংক। গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ সাধারণ বনভূমির তুলনায় বহুগুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে দীর্ঘ সময় ধরে মাটিতে সংরক্ষণ করতে পারে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সুন্দরবনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া সুন্দরবন বিপন্ন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, নোনা পানির কুমির, চিত্রা হরিণ, বানর, অসংখ্য প্রজাতির পাখি, মাছ এবং জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। এই জীববৈচিত্র্য শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালীর জীবিকা এ বনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। মধু, মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য বনজ সম্পদ দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সুন্দরবন আজ নানা সংকটে জর্জরিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ হ্রাস, অবৈধ বন উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার, প্লাস্টিক দূষণ এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়নের চাপ এই বাস্তুতন্ত্রকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলছে। সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ, বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।

পাশাপাশি বিভিন্ন সময় সুন্দরবনসংলগ্ন নৌপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে দুর্ঘটনাবশত তেল, কয়লা, রাসায়নিক পদার্থসহ বিভিন্ন দূষণকারী উপাদান নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। এসব দূষণ জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ এবং পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সুন্দরবনের আশপাশের নৌপথে পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, সুন্দরবনে পর্যাপ্ত মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে অবৈধ শিকার ও বন নিধন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, বাফার জোনে ব্যাপক ম্যানগ্রোভ বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদীপথে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানের চলাচলে কঠোর নজরদারি এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তার ভিত্তি, উপকূলের মানুষের আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ। তাই সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আমাদের প্রত্যেক নাগরিকের। সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এবং প্রকৃতি সংরক্ষণে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই আমরা এ অমূল্য সম্পদকে রক্ষা করতে পারি।

আজ আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবস। এ দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক- সুন্দরবনকে ভালোবাসব, সংরক্ষণ করব এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করব। কারণ সুন্দরবন বেঁচে থাকলে উপকূল বাঁচবে, আর উপকূল বাঁচলে বাংলাদেশ আরও নিরাপদ থাকবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, দুর্বার তারুণ্য

শান্তি সমাজ কল্যাণ সংস্থা, বেতাগী, বরগুনা।