অর্থনীতির নয়া অভিযাত্রায় সরকার : প্রত্যয়ী প্রধানমন্ত্রী
মোস্তফা কামাল
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গতিমন্থর হলেও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরছে একটু একটু করে। রূপান্তরিত দেশ গড়তে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যতিক্রম বাদে রাজনৈতিক সহাবস্থানও মন্দ নয়। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তানসহ আশপাশের দেশের তুলনায় তা ইতিবাচক। সামরিক খাতে ধরা দিচ্ছে কিছু আশা জাগানিয়া খবর। সামরিক শক্তিধর প্রশেন বিশ্বের ১৪৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৪০তম স্থানে রয়েছে। ২০২৩ সালে বার্ষিক গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের প্রতিবেদন এ বার্তা দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশ দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। যে সকল দেশ দ্রুত সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ১২তম। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার-এর প্রতিবেদনে করা হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক শক্তির বৈশিষ্ট্যকে বিশ্লেষণ করে।
বিভিন্ন খাতে নানা সূচকে এমন অগ্রগতির মাঝে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ও চেষ্টা অর্থ খাত নিয়ে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ কিছু খাত ও সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা, ওষুধ শিল্প ও উন্নত টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল সেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লজিস্টিকস অন্যতম। লক্ষ্য পূরণে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা সহজ এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। সরকারি সেবা খাতগুরোকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের চেষ্টা চলছে। যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং উৎপাদন হাব করার চেষ্টাও চলমান। তৈরি পোশাক শিল্পকে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টাও দৃশ্যমান। সেইসঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতায় অগ্রাধিকার।
এ অভিযাত্রায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সংশ্লিষ্ট টার্গেট গ্রুপকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খোলামেলা জানিয়েছেন তার আন্তরিকতার কথা। বলেছেন, নতুন ও দূরদর্শী বিএনপি সরকার চায়, আপনারা বাংলাদেশে আসুন, নতুন উদ্যোগ নিন এবং ব্যবসা প্রসারিত করুন। দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তারা মূলধন বিনিয়োগ করলে সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে তাদের পাশে থাকবে।
এটি কেবল আশ্বাস নয়, সরকারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার। বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, এর পাশাপাশি আমাদের অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুদৃঢ় ভিত্তিও রয়েছে। সেইসাথে রয়েছে একটি দ্রুত বিকাশমান বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, একঝাঁক তরুণ ও পরিশ্রমী মানবসম্পদ, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। এ বাস্তবতা বাংলাদেশকে একটি টেকসই ও স্থায়ী সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেবে বলে বিশ্বাস তার।
প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় দেশকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সাথে যুক্ত করে বেসরকারি খাতের গতিশীলতায় পরিচালিত অর্থনীতি গড়ে তোলা। বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়িক চেম্বার, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নীতি-নির্ধারকরা চান, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগের সুদৃঢ় আইনি সুরক্ষা, আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সহজীকৃত কর ব্যবস্থা। সেইসঙ্গে অর্জিত মুনাফা প্রত্যাহারের নির্বিঘ্ন প্রক্রিয়া, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো। সরকার তাদের পালস বুঝেছে।
এরইমধ্যে সেই দৃষ্টে কাজও শুরু করেছে। লাল ফিতার যন্ত্রণা কাটাতে আইনি ও রেগুলেটরি কাঠামোর আধুনিকায়ন চলছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারে নেওয়া হয়েছে আরও বিভিন্ন ব্যবস্থা। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও উন্নত করা হচ্ছে। কর ও ভ্যাট প্রশাসনকে সহজ এবং মুনাফা অর্জনের পর তা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ঝামেলামুক্ত করার দিকেও বিশেষ অ্যাটেনশন দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের প্রায় ৬০০ বিশিষ্ট প্রতিনিধিকে প্রধানমন্ত্রী তার এ বিষয়ক আন্তরিকতা ও চেষ্টার কথা জানিয়েছেন।
পরিস্কার করে বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ওপর। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, যে কোনো ব্যবসা শুধু উদ্যোক্তার দক্ষতা বা রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সফল হতে পারে না, ব্যবসার সাফল্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে সরকারের প্রবৃদ্ধি-সহায়ক নীতিমালার ওপর। সম্মেলনটির দিন দুয়েকের মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্য পদক্ষেপ। শ্রমমান ও জোরপূর্বক শ্রমণ্ডসংক্রান্ত তদন্তের পর ৮৬ দেশের ওপর নতুন মার্কিন শুল্ক নীতি। সেখানে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান বাংলাদেশের।
এখানে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর হলো, দেশটিকে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে পড়তে হয়েছে সর্বোচ্চ ১২.৫ শতাংশ শুল্কের আওতায়। তা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকার একটি আভাস। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করেছেন, শুধু কম শুল্ক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না। শ্রমমান উন্নয়ন, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে এ সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে আশাবাদ জানিয়েছে, শ্রমমান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সহযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় বাংলাদেশ নিম্ন শুল্কস্তরে স্থান পেয়েছে। ফলে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত অর্থবছরে দেশটিতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে এই বাজার থেকে।
ফলে মার্কিন বাণিজ্যনীতির যেকোনো পরিবর্তন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন যা-ই হোক, বর্তমান পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজারও খুঁজতে হবে। রাশিয়া, লাতিন আমেরিকা, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। এসব অঞ্চলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি একটি ট্যারিফ রেট কোটা ব্যবস্থা বিবেচনা করছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও টেক্সটাইল উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে সেকশন ৩০১-এর অতিরিক্ত শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়া যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে এবং মার্কিন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ।
প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কম শুল্ক সুবিধা কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অংশীদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় শ্রমমান, উৎপাদন সক্ষমতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চাপও বাড়ছে। সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের এ সন্ধিক্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমন্ত্রণ কূটনীতির সমান্তরালে অর্থনীতির আরেক বার্তা। বিশ্লেষনের অনেক উপাদান। দিল্লিতে আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর হবে সম্মেলনটি। ১১ সদস্যবিশিষ্ট ব্রিকসে বাংলাদেশ সদস্য না হলেও বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। এই মুহূর্তে ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ব্রিকসের সদস্য। ব্রিকস জোটে যোগ দিলে বা এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখলে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ও কৌশলগত কিছু সুবিধা রয়েছে, যার মধ্যে সহজ ঋণ প্রাপ্তি, বিকল্প বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো অন্যতম।
এ জোটে একদিকে যেমন নতুন অর্থায়ন ও বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা আছে, অন্যদিকে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তার চেয়ে বড় কথা বাংলাদেশকে নানাভাবে ফ্যাক্টর তথা ওজনদার ভেবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এ আমন্ত্রন। চীন, রাশিয়া, ভারতসহ পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নিয়ে অনেক দিন থেকেই চলছে নানা আলোচনা। বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণের পাশাপাশি সামনে আসছে অর্থনীতির বিভিন্ন লাভণ্ডক্ষতির হিসাবও।
মোস্তফা কামাল
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
