বন্যার ক্ষত মুছতে চাই পুনর্বাসন
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের বন্যা আবারও আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। বন্যা শুধু মানুষের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেয় না; মানুষের জীবিকা, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নও কেড়ে নেয়। এবারের বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলাসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় এ পর্যন্ত ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২ লাখের বেশি মানুষ। এ বিপুলসংখ্যক মানুষের দুর্ভোগ কোনোভাবেই সাময়িক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের পুনর্বাসন ও জীবিকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতেও ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ তিন পার্বত্য জেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। মারা গেছে ১ লাখ ৬১ হাজার গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১১ হাজার খামার। নষ্ট হয়েছে বিপুল পরিমাণ পশুখাদ্য, খড় ও ঘাস। এ পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে হাজারো পরিবারের কান্না। রয়েছে জীবনের শেষ সম্বল হারানোর বেদনা। গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে একটি গরু বা কয়েকটি ছাগল শুধু গৃহপালিত প্রাণী নয়। এটি তাদের সঞ্চয়। এটি সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানোর উপায়।
চিকিৎসার সময় এটি ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। মেয়ের বিয়ে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে এ সম্পদ বিক্রি করে পরিবারগুলো সংকট মোকাবিলা করে। একটি বন্যা যখন সেই সম্পদ কেড়ে নেয়, তখন একটি পরিবার শুধু আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে না। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এ কারণে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র করে সরকারের উদ্যোগ সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। দুর্গত মানুষের জন্য খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি জরুরি। একই সঙ্গে তাদের ফের জীবিকা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব পরিবার গবাদি পশু হারিয়েছে, তাদের গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগি দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য সহজ শর্তে সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত খামার পুনর্গঠনে সরকারি সহায়তা দিতে হবে।
প্রাণিসম্পদ খাত পুনরুদ্ধারে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা যেতে পারে। বিনামূল্যে পশুর চিকিৎসা, টিকা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করতে হবে। ব্যবস্থা করতে হবে পশুখাদ্যের। বন্যার সময় পশু নিরাপদে রাখার জন্য উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ গোয়ালঘর নির্মাণে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তালিকা তৈরি করতে হবে। তালিকা তৈরিতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা রাজনৈতিক প্রভাব যেন না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বন্যার পর পুনর্বাসন কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ আরও বাড়তে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কতা, নিরাপদ আশ্রয় এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে নদী, খাল ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখার। দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের ১২ লাখের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে শুধু ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা যাবে না। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ৫৮ জন মানুষের মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর শোকের বিষয়। এই শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাখো মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তাদের ঘর ফিরিয়ে দিতে হবে। ফিরিয়ে দিতে হবে জীবিকা। হারানো স্বপ্ন আবার দেখার সুযোগ দিতে হবে।
বন্যার পানি একসময় নেমে যায়। কিন্তু মানুষের জীবনে বন্যার ক্ষত থেকে যায় বহুদিন। সেই ক্ষত সারাতে এখনই কার্যকর পুনর্বাসন কর্মসূচি নিতে হবে। তবেই ত্রাণ কার্যক্রম সত্যিকার অর্থে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগে পরিণত হবে।
