দেশের নদীগুলোকে বাঁচতে দিন!
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নদীমাতৃক বাংলাদেশ হলেও সে অর্থে নদীর সমৃদ্ধি দেশে আর নেই। কিংবা বলা চলে, নদী এখন হয়ে গেছে কাগুজে নাম! নামণ্ডধাম পরিচয় গোত্র, ইতিহাস আছে। বাস্তবে বহু নদী মরে গেছে, মানে মেরে ফেলা হয়েছে! কিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কোনোটার কঙ্কাল পড়ে থাকে। বর্ষা এলে তাতে কিছুটা প্রাণের স্ফুরণ ঘটে। বর্ষা শেষ, আবার কঙ্কালসার। এটাই বাস্তবতা। অথচ প্রাণ ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য এ অংশটি হতে পারত আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
সাতক্ষীরা জেলার কপোতাক্ষ, ইছামতী, বেতনা নদী এবং বিভিন্ন খাল তিন শতাধিক দখলদার বিভিন্নভাবে দখল করে আছে। অবশ্য ইতিবাচক দিক হচ্ছে, এটি এরইমধ্যে চিহ্নিত করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। তাদের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিন তদন্ত ও পুনঃযাচাই করার পর তালিকাটি চূড়ান্তও করেছে। এ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে দায়িত্বে তৎপর মনে হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রশ্নটি হচ্ছে, বছরের বছর এ দখলদারদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কীভাবে তারা এ পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে?
এ দখলদারির কারণে যেটা হয়েছে, তা ভয়াবহ। সাতক্ষীরা জেলার জলাবদ্ধতার কথা সবার জানা। এটা নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এক অভিশাপ। আর সংকটির মূলে রয়েছে এ জেলার প্রাণপ্রবাহ কপোতাক্ষ, ইছামতী ও বেতনা নদীসহ বিভিন্ন খাল-বিলের টুঁটি চেপে ধরা অবৈধ দখলদারিত্ব। জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এর ভয়াবহ চিত্র। তিনটি নদীর বুক চিরে গড়ে উঠেছে ইটভাটা, শিল্প-কারখানা, মাছের ঘের আর বসতবাড়ি। সদর উপজেলার বাবুলিয়া মৌজায় নদীর জমি গ্রাস করে বছরের পর বছর চলছে ইটভাটা; বিনেরপোতায় বেতনা নদীর সীমানা প্রাচীর ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে তালা উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় শতাধিক ব্যক্তি কপোতাক্ষের জমি দখল করে স্থায়ী-অস্থায়ী ঘরবাড়ি ও পুকুর তৈরি করেছে। অনুমান করা কঠিন নয় যে, প্রভাবশালী মহলের এমন বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের খেসারত দিতে হচ্ছে জেলার সাধারণ মানুষকে। সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে শহর ও গ্রামাঞ্চল, স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন।
বিলম্বে হলেও দখলদারদের চিহ্নিত করে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ পরিকল্পনা এবং দখলদারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও শুভ পদক্ষেপ।
জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে তালিকাটির প্রকাশ জনমনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। অতীতেও এমন বহু তালিকা প্রণয়ন ও আশ্বাসের বাণী দেখা গেছে, যা পরবর্তী সময়ে আলোর মুখ দেখেনি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, এবারের অভিযান কি সত্যিই নদীগুলোকে মুক্ত করবে নাকি এটিও গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে? আমরা মনে করি, প্রাণ-প্রকৃতি তথা মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যেই নদী বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। জনস্বার্থ সর্বদা ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে। ফলে সাতক্ষীরাকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে হলে নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে নদী রক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোর ও আপসহীন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাধারণ চুনোপুঁটিদের উচ্ছেদ করে যদি রাঘববোয়ালদের স্পর্শ না করা হয়, তবে এ অভিযানের মূল উদ্দেশ্যও ভেস্তে যাবে। একেবারে ক্ষুদ্রার্থে মানুষের স্বার্থ ধরলেও নদীগুলোকে বাঁচতে দিতে হবে।
