নিশ্চিত হোক শিশুদের নিরাপদ শৈশব
মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজকের শিশুই আগামীর দেশ ও জাতির প্রকৃত সম্পদ। তারাই মূলত দেশ ও জাতি গঠনের কারিগর। একটি শিশুর জন্মের সঙ্গে শুধু একটি পরিবারের নতুন সদস্যের আগমন ঘটে না; জন্ম হয় একটি জাতির নতুন সম্ভাবনার। আজ যে শিশু মায়ের কোলে, আগামীকাল সেই-ই হতে পারে একজন আলিম, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, বিচারপতি, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, এমপি মন্ত্রী, সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান কিংবা দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত উন্নত মানবিক চরিত্রের অধিকারী সুনাগরিক।
তাই শিশুদের নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করা শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং সমগ্র মানবসমাজের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও অসংখ্য শিশু এখনও শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আবেগগত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতন শুধু দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিত্তবান পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, এমনকি ডিজিটাল জগতেও শিশুরা নানা ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই ‘শাসন’, ‘শিক্ষা’ কিংবা ‘শৃঙ্খলা’র নামে শিশু নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। অন্যথায় নিষ্পাপ ও সম্ভাবনাময় এই শিশুদের উজ্জল ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
শাসন ও নির্যাতনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে : শিশু সন্তানকে সৎ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রতিটি অভিভাবকের প্রধানতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। একইভাবে তাদের চরিত্র গঠন ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সম্মানিত শিক্ষকগণের ভুমিকা নি:সন্দেহে অপরিসীম। তাদেরকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনে শাসন করবেন। তবে শাসনের নামে তাদেরকে অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, কোনরূপ ভয় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শাসনের উদ্দেশ্য হলো ভুল সংশোধন, নৈতিক শিক্ষা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলা। অপরদিকে নির্যাতনের ফল হলো ভয়, অপমান, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং মানসিক ক্ষত।
একজন শিশু যদি তার অভিভাবক বা শিক্ষককে সম্মান নয়, বরং ভয় করতে শেখে, তাহলে সেখানে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। ভয় সাময়িক আনুগত্য সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তা কখনও সুস্থ ব্যক্তিত্ব গঠনে ইতিবাচক ভুমিকা রাখতে পারে না।
মানসিক নির্যাতন নীরব কিন্তু ক্ষত অত্যন্ত গভীর : আমাদের সমাজে শারীরিক আঘাতকে নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও মানসিক নির্যাতনকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে অবহেলা করা হয়ে থাকে। ‘তুমি কিছুই পারবে না’, ‘তুমি অন্যদের মতো নও’, ‘তুমি আমাদের লজ্জা’, ‘তুমি অথর্ব অকর্মণ্য’ ইত্যাদি বাক্যের বহুল ব্যবহার শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। সবার সামনে অপমান করা, ভাই-বোন বা সহপাঠীর সঙ্গে তুলনা করা, ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করা, শিশুর মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া কিংবা তার প্রতিটি ভুলকে ব্যক্তিত্বের ব্যর্থতা হিসেবে উপস্থাপন করা- এসব আচরণ দীর্ঘমেয়াদে শিশুর আত্মমর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আজও শৈশবে শোনা অপমানজনক কথাগুলো ভুলতে পারেন না। শারীরিক আঘাতের ক্ষত একসময় সেরে যায়, কিন্তু মানসিক আঘাত কখনও কখনও সারাজীবন বহন করতে হয়। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে নির্যাতনের নেতিবাচক প্রভাব : মানুষের মস্তিষ্কের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশের সময় হলো শৈশবকাল। এ সময় নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও ইতিবাচক সম্পর্ক শিশুর মানসিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে তোলে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ভয়, অপমান ও সহিংসতার পরিবেশে বেড়ে উঠলে শিশুর শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সম্পর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং পারিবারিক জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইসলামের শিক্ষা: দয়া, ভালোবাসা ও মর্যাদা : ইসলামের মূল শিক্ষা হলো রহমত, ন্যায় ও মানবিকতা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের প্রতি অসাধারণ স্নেহ, ভালোবাসা, ধৈর্য ও কোমলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি শিশুদের সালাম দিতেন, তাদের সঙ্গে খেলতেন, কোলে নিতেন এবং তাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতেন। তিনি বলেছেন: যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (জামে তিরমিজি)
পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ তাআলা ন্যায়, দয়া ও উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা তাই ইসলামের নৈতিক আদর্শের সঙ্গে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
আইন ও নৈতিকতার সমন্বয় জরুরি : শিশুদের সুরক্ষায় যথাযথ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। পাশাপাশি আইন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, যথাসম্ভব দ্রুততম সময়ে বিচার কার্যকর করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যেখানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়, সেখানে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে শিশু সুরক্ষায় ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক নিরাপদ আশ্রয় : শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে হবে এমন, যেখানে শিশুরা আনন্দ উৎসাহ নিয়ে শিখবে, প্রশ্ন করবে এবং নিজের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ লাভ করবে। শিক্ষকের হাতে যদি ভয়, অপমান বা সহিংসতার উপাদান থাকে, তবে শিক্ষা তার মানবিক উদ্দেশ্য হারায়।
শিক্ষককে শুধু পাঠদাতা নয়, একজন পথপ্রদর্শক ও চরিত্র নির্মাতা হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। ইতিবাচক শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়সঙ্গত আচরণই শিক্ষার প্রকৃত ভিত্তি।
ডিজিটাল যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ : আজকের শিশুরা বাস্তব জগতের পাশাপাশি ডিজিটাল জগতেও বেড়ে উঠছে। সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান- এসবও মানসিক নির্যাতনের আধুনিক রূপ। তাই শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন সময়ের দাবি।
সমাজের করণীয় : শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। এজন্য-
পরিবারে অহিংস ও ইতিবাচক অভিভাবকত্বের চর্চা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন। শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা। শিক্ষক, অভিভাবক ও ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণ। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা। গণমাধ্যমে শিশু অধিকারবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি। নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত শক্তি তার শিশুদের হাসিতে, তাদের আত্মবিশ্বাসে এবং তাদের নিরাপদ শৈশবে। শিশুদের ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন শুধু একটি শিশুর ক্ষতি করে না; ক্ষতি করে একটি জাতির ভবিষ্যতের অমিত সম্ভাবনাকে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুরা দুর্বল নয়; তারা সম্ভাবনার বীজ। সেই বীজকে সহিংসতার আগুনে পোড়ানো নয়, বরং ভালোবাসা, নৈতিক শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।
শিশুকে ভয় নয়, স্বপ্ন দেখাতে হবে; হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি নয়, ভালোবাসার বীজ বপন করতে হবে ; নির্যাতন নয়, মানবিকতার স্পর্শ দিয়ে আগলে রাখতে হবে। একটি নিরাপদ শৈশবই একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করতে পারে।
মো. মুখলেছুর রহমান
লেখক : সাবেক প্রিন্সিপাল জামেয়া দ্বীনিয়া ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক তামিরুল মিল্লাত মাদরাসা, টঙ্গী শাখা
