সঠিক খাবার শুধু শরীর নয়, ভালো রাখে মস্তিষ্ক ও মন
মাহ্ফিদা দীনা রূবাইয়া
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা সাধারণত সুস্থতার কথা বললে রোগমুক্ত শরীরের কথাই বেশি ভাবি। কিন্তু সুস্থতা শুধু শারীরিক অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষের প্রকৃত সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে তার শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বয়ের ওপর। তাই সুস্থ জীবনের জন্য যেমন প্রয়োজন রোগমুক্ত শরীর, তেমনি প্রয়োজন ভয়, হতাশা, বিষণ্ণতা ও অতিরিক্ত মানসিক চাপমুক্ত একটি সুন্দর মন। সুষম খাদ্য গ্রহণ শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এ বিষয়টি সবার জানা। তবে খাদ্যাভ্যাস যে আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম, আবেগ, চিন্তাশক্তি এবং মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে, তা অনেকের কাছেই অজানা। বর্তমান সময়ে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার সমস্যা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। খাদ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক : ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক অবস্থা ও কাজের ধরন অনুযায়ী সুষম খাদ্য গ্রহণ শরীর ও মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, দানা শস্য, মাছ এবং অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার থাকে, তাদের মধ্যে বিষন্নতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে। অন্যদিকে, কম পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার, অতিরিক্ত চর্বি, বেশি চিনি, পরিশোধিত শর্করা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের অতিরিক্ত ব্যবহার শরীরের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শৈশবকাল, বিশেষ করে জন্ম থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত সময়, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব ভবিষ্যতে শিশুর মানসিক বিকাশ ও আচরণগত স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র : অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় কম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণও ক্ষতিকর। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভারসাম্যহীন খাদ্যাভ্যাস স্থূলতার অন্যতম কারণ। স্থূলতার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে স্থূলতার ঝুঁকি বেশি হতে পারে এবং স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যেও বিষণ্ণতার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। অপরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ কিছু মানসিক সমস্যার উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও জানা যায়।
খাদ্য কীভাবে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখে : আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত পুষ্টি। প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের কোষগুলোর কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে।
খাদ্য মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে। অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে স্বাস্থ্যকর খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্ত্রের সুস্থতা মস্তিষ্কের কার্যক্রম, চিন্তাভাবনা ও মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে।
পরিপাকতন্ত্রে উৎপন্ন সেরোটোনিন নামের নিউরোট্রান্সমিটার আমাদের আনন্দ, ঘুম, আবেগ ও মানসিক স্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সেরোটোনিন তৈরির প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু খাদ্য উপাদান-
জিংক : জিংক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণ এবং মানসিক সুস্থতায় সহায়ক। খাদ্যে জিংকের ঘাটতি বিষন্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দই, মাছ, গরুর মাংস, ডিম, দুধ, পনির, কুমড়ার বীজ, মাশরুম, চিনাবাদাম, কাজুবাদাম ও পালংশাকে জিংক পাওয়া যায়।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড : মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, চিন্তাশক্তি ও মেজাজ ভালো রাখতে ওমেগা-৩ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাছের তেল, সামুদ্রিক মাছ, ইলিশ, আখরোট, চিয়া সিড, তিসির তেল ও সয়াবিনে ওমেগা-৩ পাওয়া যায়। এটি মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট : অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার শরীরের ক্লান্তি কমায়, প্রাণশক্তি বজায় রাখে এবং স্মৃতিশক্তি রক্ষায় সহায়তা করে। ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, বিটা ক্যারোটিন, বাদাম ও লাল আটায় এসব উপাদান পাওয়া যায়।
ভিটামিন বি-১২ : ভিটামিন বি-১২ এর অভাবে অবসাদ, ক্লান্তি, বিরক্তি, মানসিক চাপ এবং ভুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। দুধ, ডিম, পনির ও কম চর্বিযুক্ত দই ভিটামিন বি-১২ এর ভালো উৎস।
ভিটামিন সি : ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং সেরোটোনিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। লেবু, কমলা, আমলকি, জাম্বুরা, মাল্টা, কাঁচা মরিচ, পেঁপে ও সবুজ শাকসবজিতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
আয়রন : আয়রনের ঘাটতিতে রক্তস্বল্পতা তৈরি হয়, যার ফলে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও মানসিক অবসাদ দেখা দিতে পারে। কলিজা, গরুর মাংস, ডিম, ছোলা, শিমের বিচি, খেজুর, কিশমিশ ও বিভিন্ন সবুজ শাকে আয়রন পাওয়া যায়।
ভিটামিন ডি : ভিটামিন ‘ডি’ এর অভাবে মানসিক অবসাদ ও বিষণ্ণতার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। ভিটামিন ডি-এর প্রধান প্রাকৃতিক উৎস সূর্যের আলো। এছাড়াও চর্বিযুক্ত মাছ, ডিমের কুসুম, এবং ফর্টিফাইড খাবার থেকে এই ভিটামিন পাওয়া যায়।
দানা শস্য : লাল চাল, লাল আটা ও শস্যজাত খাবারে আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে। এসব খাবার ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে, ফলে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ও মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করে। অতিরিক্ত পরিশোধিত শস্যের তুলনায় গোটা বা দানা শস্য বেশি উপকারী।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলি : শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক পরিশ্রম এবং দৈনিক ক্যালরির চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য নির্বাচন করতে হবে।
শুধু রোগ প্রতিরোধের জন্য নয়, একটি সুন্দর মন, ভালো চিন্তা ও কর্মক্ষম জীবন নিশ্চিত করতেও প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। তাই আসুন, আমরা প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পুষ্টিকর খাবার অন্তর্ভুক্ত করি এবং শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দিই।
মাহ্ফিদা দীনা রূবাইয়া
লেখক : প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও পুষ্টিবিদ, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন
