এআই গভর্ন্যান্সে জাতিসংঘ : নেতৃত্ব সীমাবদ্ধতা ভবিষ্যৎ

সাইফুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তি খাতের বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, সমাজ ও বৈশ্বিক রাজনীতির এক শক্তিশালী নিয়ামক হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, গণমাধ্যম ও উৎপাদন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা, নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল সংকট মোকাবিলায় এআই অভূতপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি করছে। অন্যদিকে ডিপফেইক, ভুয়া তথ্য, অ্যালগরিদমিক বৈষম্য, সাইবার হামলা, গণনজরদারি এবং প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থার মতো ঝুঁকি বিশ্বকে নতুন ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এ দ্বিমুখী বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এআই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে কে এবং কীভাবে? প্রশ্নটি অনেকটা ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে’ ধরনের জটিল ধাঁধা। কারণ এআইয়ের প্রভাব রাষ্ট্রীয় সীমান্ত অতিক্রম করলেও এর নিয়ন্ত্রণ এখনও প্রধানত জাতীয় আইন, আঞ্চলিক বিধিব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। একই প্রযুক্তির জন্য এক দেশে কঠোর নিয়ম থাকলেও অন্য দেশে প্রায় কোনো কার্যকর নিয়মই নেই। প্রযুক্তির বৈশ্বিক বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার এ বিচ্ছিন্নতার কারণেই এআই গভর্ন্যান্সে জাতিসংঘের ভূমিকা ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জাতিসংঘের এ প্রচেষ্টা অবশ্য শূন্য থেকে শুরু হয়নি। ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর ইউনেসকোর ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা বিষয়ক সুপারিশ’ গ্রহণ করে। এটি এআই নৈতিকতা নিয়ে প্রথম বৈশ্বিক মানদণ্ড। সুপারিশটিতে বলা হয়, এআই ব্যবস্থা নিরীক্ষাযোগ্য ও অনুসরণযোগ্য হতে হবে এবং কোনো যন্ত্র বা অ্যালগরিদম মানুষের চূড়ান্ত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতাকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।

এরপর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আসে ২০২৪ সালের ২১ মার্চ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ নিরাপদ, সুরক্ষিত ও বিশ্বাসযোগ্য এআই ব্যবস্থার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তাব ৭৮/২৬৫ গ্রহণ করে। ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’-এর অংশ হিসেবে গৃহীত হয় ‘গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট’। ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের আলোচনায় তৈরি এ কমপ্যাক্ট ডিজিটাল সহযোগিতা ও এআই গভর্ন্যান্সের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক কাঠামো। এতে ডিজিটাল বৈষম্য কমানো, মানবাধিকার রক্ষা, নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের অঙ্গীকার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি ঘটে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট। সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব ৭৯/৩২৫-এর মাধ্যমে ‘ইন্ডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্টিফিক প্যানেল অন এআই’ এবং ‘গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রস্তাবটিতে স্পষ্ট করা হয়, প্যানেলের কাজ হবে এআইয়ের সুযোগ, ঝুঁকি ও প্রভাব সম্পর্কে স্বাধীন ও প্রমাণভিত্তিক বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন দেওয়া। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ পরিষদ বৈজ্ঞানিক প্যানেলের ৪০ সদস্যকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়। ০৩ মার্চ প্যানেলের প্রথম বৈঠকে কানাডার কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও টুরিং পুরস্কারজয়ী ইয়োশুয়া বেঙ্গিও এবং ফিলিপাইনের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক মারিয়া রেসা যৌথ সভাপতি নির্বাচিত হন। প্যানেলটি ০১ জুলাই ২০২৬ তার প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে । ০৬ ও ০৭ জুলাই জেনেভায় অনুষ্ঠিত প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্সে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এ সংলাপে বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রযুক্তি কোম্পানি, গবেষক, নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রযুক্তি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংলাপের আগে ছয় মাস ধরে চলা বৈশ্বিক পরামর্শ প্রক্রিয়ায় দেড় হাজারের বেশি লিখিত মতামত জমা পড়ে। এতে অংশীজনদের অগ্রাধিকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখা যায়। সরকারগুলো এআই সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। বিপরীতে অধিকাংশ বেসরকারি অংশীজন নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে।

জাতিসংঘের নেতৃত্ব প্রয়োজন : বাস্তবতা হলো, উন্নত এআই মডেল, সেমিকন্ডাক্টর, কম্পিউটিং অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও গবেষণা সক্ষমতা অল্প কয়েকটি দেশ ও কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের হিসাবে, ২০২২ সালে মাত্র ১০০টি কোম্পানি বিশ্বের ব্যবসায়িক গবেষণা ও উন্নয়ন বিনিয়োগের ৪০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছিল। চীন ছাড়া উন্নয়নশীল কোনো দেশের কোম্পানি শীর্ষ ১০০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল না। অথচ অ্যালগরিদমিক বৈষম্য, চাকরির অনিশ্চয়তা, ভুয়া তথ্য, নজরদারি এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের প্রভাব বহন করবে প্রায় সব দেশ।

উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী কয়েকটি দেশ নিজেদের মধ্যে নিয়ম তৈরি করলে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো মূলত সেই নিয়মের অনুসারী হয়ে থাকবে। জাতিসংঘের মঞ্চ অন্তত প্রতিটি রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমান আসন দেয়। বাংলাদেশ, নেপাল বা কেনিয়ার মতো দেশ সেখানে শুধু প্রযুক্তির সম্ভাব্য বাজার নয়; নীতি প্রণয়ন ও আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়। বৈশ্বিক এআই গভর্ন্যান্সে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় মূল্য এখানেই।

জাতিসংঘের দ্বিতীয় শক্তি হলো বিজ্ঞান ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা। স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্যানেলটি কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়। এটি আইন তৈরি, শাস্তি প্রদান বা কোনো দেশের নীতি নির্ধারণ করবে না। এর কাজ হলো এআইয়ের সুযোগ, ঝুঁকি ও প্রভাব সম্পর্কে স্বাধীন, নীতিসংশ্লিষ্ট কিন্তু নির্দেশনামূলক নয় এমন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন দেওয়া। এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যথাযথ বিনিয়োগ ও শ্রমনীতি না থাকলে এআই বিদ্যমান বৈষম্য বাড়াতে পারে, শ্রমিকদের স্থানচ্যুত করতে পারে এবং সম্পদ শ্রম থেকে পুঁজির দিকে স্থানান্তর ত্বরান্বিত করতে পারে।

তৃতীয়ত, জাতিসংঘ সব দেশের ওপর হুবহু একই আইন চাপিয়ে না দিয়েও বিভিন্ন দেশের নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে। সব দেশের অর্থনীতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এক নয়। ফলে একটি অভিন্ন বৈশ্বিক এআই আইন এখনই বাস্তবসম্মত নয়। তবে ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, বড় ধরনের এআই দুর্ঘটনা জানানো, অ্যালগরিদমিক নিরীক্ষা, শিশু ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার পাওয়ার অধিকারের মতো ক্ষেত্রে কিছু ন্যূনতম বৈশ্বিক মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।

কোনো এআই ব্যবস্থার সিদ্ধান্তে একজন ব্যক্তি ঋণ, চাকরি, চিকিৎসা, শিক্ষা বা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে তিনি কীভাবে সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাইবেন, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। একইভাবে কৃত্রিম ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে নির্বাচন, জননিরাপত্তা বা সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে প্রযুক্তি কোম্পানি, সেবাদাতা ও ব্যবহারকারীর দায় কী হবে, সেটিও আন্তর্জাতিক আলোচনায় আনতে হবে। শুধু প্রযুক্তিকে নিরাপদ করাই যথেষ্ট নয়; তথ্যের অখণ্ডতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক স্বাধীনতাও রক্ষা করতে হবে।

সীমাবদ্ধতা কোথায় : জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামোর বড় সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গ্লোবাল ডায়ালগ ও বৈজ্ঞানিক প্যানেল কোনোটিই বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রক বা প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নয়। বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তি কোম্পানির বাণিজ্যিক গোপনীয়তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থ, অবকাঠামো ও দক্ষতার ঘাটতি নীতিগত ঐকমত্যকে দুর্বল করতে পারে। শুধু সংলাপ আয়োজন বা নৈতিক নীতি ঘোষণার মাধ্যমে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট, বৈজ্ঞানিক প্যানেল এবং গ্লোবাল ডায়ালগের মূল কার্যপরিধি বেসামরিক এআইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, সামরিক নজরদারি এবং মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া লক্ষ্য নির্বাচন করতে সক্ষম ব্যবস্থা মানবনিরাপত্তার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর অন্যতম। বেসামরিক ও সামরিক এআই নিয়ে আলোচনা আলাদা প্রক্রিয়ায় চললেও তাদের মধ্যে নীতিগত সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের করণীয় : বাংলাদেশের জন্য এ প্রক্রিয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যরা নিয়ম তৈরি করার পর তা অনুসরণ করার পরিবর্তে বাংলাদেশকে এখন থেকেই সক্রিয় অবস্থান নিতে হবে। বাংলা ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতির যথাযথ প্রতিনিধিত্ব, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, নাগরিকের তথ্য ও ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার এবং ডিজিটাল সরকারি সেবার জবাবদিহিতাকে বৈশ্বিক আলোচনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

জলবায়ু ও দুর্যোগের পূর্বাভাস, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সরকারি সেবায় নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এআই ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি যৌথ অবস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য পরিবর্তন মোকাবিলায় তরুণদের প্রশিক্ষণ, পুনর্দক্ষতা অর্জন এবং স্থানীয় গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি আন্তর্জাতিক অর্থায়নের আলোচনায় তুলতে হবে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু বিদেশি এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হওয়া নয়; বাংলা ভাষাভিত্তিক মডেল, স্থানীয় তথ্যভাণ্ডার, জনস্বার্থভিত্তিক প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল নীতি প্রণয়নে অংশীদার হওয়া উচিত। অন্যথায় বাংলাদেশ প্রযুক্তি গ্রহণ করবে, কিন্তু সেই প্রযুক্তির নিয়ম, মূল্যবোধ ও সীমারেখা নির্ধারণ করবে অন্যরা।

পরিশেষে, এআইকে মানবকল্যাণের শক্তিতে পরিণত করতে হলে প্রযুক্তির গতির সঙ্গে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার গতিকেও তাল মেলাতে হবে। জাতিসংঘ সেই নেতৃত্ব দিতে পারে, তবে শর্ত একটাই: আলোচনা ও নৈতিক ঘোষণার গণ্ডি পেরিয়ে তাকে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বাস্তব জবাবদিহিতার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট