দুর্নীতির দুষ্টচক্র ভাঙতেই হবে
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিমের নাম বাংলাদেশের চিকিৎসা ইতিহাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও বারডেম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি দেশের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল মানুষের সেবা করা। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের কোটি মানুষের আস্থার জায়গা। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও এর অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে অর্থ লোপাট, কমিশন বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, প্রকল্পের অর্থ স্থানান্তর, অস্বাভাবিক ব্যয় এবং কর্মীদের চাকরিচ্যুতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানটির ভিত দুর্বল করে দিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক নেই-এর মধ্যে আছে রমরমা নিয়োগ বাণিজ্য। প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষ ও যোগ্য লোকের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি যোগ্যতার চেয়ে অর্থ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পায়, তাহলে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। নিয়োগ বাণিজ্য শুধু একজন যোগ্যপ্রার্থীকে বঞ্চিত করে না। এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা নষ্ট করে। অযোগ্য মানুষ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে গেলে রোগীর সেবা ব্যাহত হয়। প্রশাসনে দুর্নীতি বাড়ে। প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
প্রতিবেদনে একটি সর্বগ্রাসী দুষ্টচক্রের কথাও উঠে এসেছে। এ চক্রের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ও চিকিৎসক জড়িত। তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন। অনিয়মের প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানো বা বদলির মতো শাস্তির মুখে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতি উদ্বেগের। কারণ এক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠান আর সেবার জায়গা থাকে না। সেটি একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়। বারডেমের এক মাসে অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এক খাতে কয়েক মাসের তুলনায় হঠাৎ কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয়ের কারণ কী, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে হবে। প্রকল্পের অর্থ অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর, ব্যক্তিগত কাজে প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার এবং অডিট এড়ানোর চেষ্টা থাকলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
একটি অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরি। প্রতিষ্ঠানটি যদি সত্যিই বিপুল ঋণের বোঝায় থাকে, তাহলে সেই ঋণের কারণও খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পদ ও আয় যাচাই করা প্রয়োজন। বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য না থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও বারডেমের মতো প্রতিষ্ঠানের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু অতীতের অবদান কোনো অনিয়মের দায় থেকে কাউকে মুক্তি দিতে পারে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশন ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অডিট করতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, তদন্তে কোনো দুষ্টচক্রের অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোগীর সেবা কোনো ব্যক্তির ব্যবসা বা কোনো গোষ্ঠীর সম্পদ লুটের আখড়া হতে পারে না। সর্বগ্রাসী দুষ্টচক্রের হাত থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুক্ত করতে হবে, তা না হলে একটি মহান উদ্যোগ ধীরে ধীরে তার মূল আদর্শ হারিয়ে ফেলবে। আর সেই ক্ষতির সবচেয়ে বড় শিকার হবে সাধারণ মানুষ।
