টেকসই উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ
মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা
(এমডিজি, ২০০১-২০১৫) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি, ২০১৫-২০৩০) অর্জনের সর্বজনীন লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য হ্রাস। বাংলাদেশ এ লক্ষ্য অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এখনও অনেক দূরে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনও প্রায় ৪ কোটি ১৭ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। ২০০১ সালে এ হার ছিল ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ গত ২৩ বছরে চরম দারিদ্র্য মাত্র ৬ শতাংশ কমেছে।
দারিদ্র্য নিয়ে বহু সংজ্ঞা, তত্ত্ব ও গবেষণা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরও দারিদ্র্য প্রত্যাশিত হারে কমেনি।
দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল- প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থান হবে, কর্মসংস্থান বাড়লে আয় বাড়বে, আর আয় বাড়লেই দারিদ্র্য কমবে। বাস্তবে দেখা গেছে, ওপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেওয়া এ উন্নয়ন ধারণা সব ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। তাই দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য তৃণমূলভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উৎপাদনমুখী উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি ও অকৃষি উভয় খাতেই উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারী-পুরুষের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক উৎপাদনকারীরা এখনও ব্যাংক ও প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পান না। ফলে ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোফাইন্যান্স তাদের জন্য একটি কার্যকর আর্থিক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এর অবদান অনস্বীকার্য। প্রাথমিক মূলধনের অভাবে যারা উদ্যোক্তা হতে পারতেন না, ক্ষুদ্রঋণ তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। শুধু জীবিকার উন্নয়ন নয়, এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা লাখো মানুষকে আর্থিক সেবার আওতায় এনে মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়নের পথকে শক্তিশালী করেছে। তবে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এখনও সমানভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা যায়নি। বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থানকারী ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থাপনার রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দ্য রুরাল পুওর (ডর্প) মনে করে, আর্থিক সুযোগপ্রাপ্তি একটি মৌলিক মানবাধিকার। তাদের মতে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু ঋণ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং সঞ্চয়, আমানত, অর্থ প্রেরণসহ পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জামানতবিহীন ঋণ দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করছে। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে, আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ক্ষুদ্রঋণ ভবিষ্যতেও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশে ৭২৪টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার সদস্যকে সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে ৯৫ দশমিক ৮২ শতাংশই নারী।
সদস্যদের মোট ঋণস্থিতি ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪১০ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়ের পরিমাণ ৬৮ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠান ২ লাখ ৬১ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যার প্রায় অর্ধেক কৃষি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে। এসব তথ্য প্রমাণ করে যে, ক্ষুদ্রঋণ শুধু অর্থায়ন নয়; বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধিরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে মাইক্রোফাইন্যান্স বাংলাদেশের দারিদ্র্য প্রায় ১০ শতাংশ কমাতে সহায়তা করেছে এবং প্রায় ২৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে। তবুও সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এখনও এই সেবার বাইরে রয়েছে। নারীরা মাইক্রোফাইন্যান্স খাতের প্রধান উপকারভোগী হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নারীর নামে নেওয়া ঋণ ব্যবহার করেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। ফলে প্রকৃত অর্থে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ঋণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।
মাইক্রোফাইন্যান্স খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও এটি এখনও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অতিরিক্ত ঋণের বোঝা একটি বড় সমস্যা। অনেক ঋণগ্রহীতা একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন; কিন্তু তা সঠিকভাবে পরিচালনা করার দক্ষতার অভাবে ঋণ ফেরত দিতে ব্যর্থ হন। এ ছাড়া ঋণের অপব্যবহারও একটি বড় সমস্যা। উদাহরণস্বরূপ, সহজে প্রাপ্ত জাগরণ ঋণ কখনও কখনও আয় বর্ধনকারী কাজের জন্য নেওয়া হলেও তা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কাজে ব্যবহার করা হয়। এ সমস্যাগুলো মাইক্রোফাইন্যান্স খাতে পরিবীক্ষণ বাড়ানো এবং ঋণগ্রহীতাদের আরও ঋণ ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এ ধরনের সমস্যাগুলো সমাধানে মাইক্রোফাইন্যান্স কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৫ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার মূলধনের মাধ্যমে ২০০-এর বেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ, ৩৫ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ১৪ লাখ কৃষককে আর্থিক সেবার আওতায় এনেছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। সম্প্রতি ক্ষুদ্র উদ্যোগের টেকসই বিকাশে ‘ব্লেন্ডেড অর্থায়ন স্কিম’ চালুর উদ্যোগও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আশা করি সময়োপযোগী এ ধরনের পদক্ষেপ দারিদ্র্য বিমোচনে টেকসই ভূমিকা রাখবে।
মাইক্রোফাইন্যান্সকে আরও কার্যকর করতে হলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া, ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তোলা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করাই হতে পারে টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর পথ। অর্থায়নের সুযোগকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। তাহলেই একটি অধিকতর ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান
লেখক: গবেষক ও উপনির্বাহী পরিচালক, ডর্প
