মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত কোনো প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ। একটি প্রকল্পের প্রতিটি টাকা ব্যয়ের পেছনে থাকতে হবে প্রয়োজন, যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের বড় প্রকল্পে পরিকল্পনা ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ এসব প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। সামান্য অনিয়মও রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিটিসিএলের ৫জি প্রকল্প নিয়ে প্রতিবেদন গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেদনে প্রকল্পটির ব্যয়, যন্ত্রপাতি কেনা, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিটিসিএলের সম্ভাব্য ব্যান্ডউইথ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৬ দশমিক ২ টেরাবাইট। সেই চাহিদা পূরণে ১০০জি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর সুপারিশ করা হয়েছিল। অথচ পরবর্তী সময়ে ১২৬ টেরাবাইট সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনের তুলনায় এত বেশি সক্ষমতার যন্ত্রপাতি কেনার প্রয়োজন দেখা দিল কেন? আরও প্রশ্ন হলো, এ কারণে প্রকল্পের ব্যয় ১৬৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩২৬ কোটি টাকা হলো কেন? জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি প্রকল্পে প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিক ব্যাখ্যা অবশ্যই দিতে হবে। কোনো যন্ত্রপাতি মানসম্মত হলেই তা কেনার যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয় না। সেটি রাষ্ট্রের কতটা প্রয়োজন, সেটিই প্রথম বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত।
লুটপাটের জন্য প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো আমাদের দেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর নানা অভিযোগ আমরা দেখেছি। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, অস্বাভাবিক ব্যয় এবং অতিরিক্ত দামে সরঞ্জাম কেনার অভিযোগও নতুন নয়। জনগণের অর্থের অপচয় এবং দুর্নীতির এ সংস্কৃতি কোনোভাবেই চলতে পারে না।
এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুদক প্রকল্পটির ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের অবশিষ্ট ক্রয় কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য দুদককে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কোনো তদন্তাধীন প্রকল্পে আইন ও বিধি অনুসরণ না করে তৎপরতা চালানো হলে তা তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সরকারি অর্থ ব্যয় করা যাবে না। প্রকল্পের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে জনগণের স্বার্থ বিবেচনায়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনতে হবে। অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয় করা যবে না।
এ ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বহাল থাকলে দুর্নীতি বন্ধ হবে না। একের পর এক প্রকল্পে জনগণের অর্থ লুটপাটের সুযোগ তৈরি হবে। তাই বিটিসিএলের ৫জি প্রকল্প নিয়ে ওঠা অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে। অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
