শব্দের অপব্যবহার ও হেয়প্রতিপন্নমূলক কথার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

ড. জেসান আরা

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শব্দের শক্তি দ্বিমুখী। একটি কোমল বাক্য যেমন ভেঙে পড়া মনকে আশার আলো দেখাতে পারে, তেমনি একটি তীক্ষণ্ণ ও অবমাননাকর শব্দ মুহূর্তের মধ্যেই একজন মানুষের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দিতে পারে। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের অনুভূতি, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিত্ব গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

এটি মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এই ভাষা যেমন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তেমনি এর অপব্যবহার যেমন একটি তির্যক মন্তব্য, অবমূল্যায়নমূলক কথা বা বিষাক্ত কটূক্তি মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দিতে পারে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা বিশ্বাস।

বিশেষ করে হেয় করে কথা বলা, তাচ্ছিল্য করা বা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার এক ধরনের মানসিক নির্যাতন, যা ব্যক্তির আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক সম্পর্ককে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক সময় একটি কষ্টদায়ক কথা শারীরিক আঘাতের চেয়েও বেশি মানসিক কষ্ট দেয়।

পরিবার, স্কুল, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয় করে কথা বলার ঘটনা এখন খুবই সাধারণ। আর এই শব্দ যখন প্রকাশের মাধ্যম না হয়ে কারও আত্মসম্মানকে চূর্ণ করার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা এক ধরনের অদৃশ্য; কিন্তু অত্যন্ত ক্ষতিকর মানসিক সহিংসতায় রূপ নেয়। এর ফলে আত্মসম্মান কমে যায়, মানসিক চাপ বাড়ে এবং ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে। তাই শব্দের অপব্যবহার ও এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি।

শব্দের অপব্যবহার বা হেয়প্রতিপন্নমূলক কথা বলতে বোঝায় এমন ধরনের মৌখিক আচরণ, যা ইচ্ছাকৃতভাবে বা অবলীলায় অন্যকে ছোট করতে, তার আত্মসম্মানে আঘাত হানতে কিংবা তাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিতে ব্যবহার করা হয়। এটি হতে পারে তীব্র চিৎকার, অপমানজনক শব্দচয়ন, ক্রমাগত সমালোচনা, উপহাস কিংবা পরোক্ষ কটূক্তি।

অনেকে শারীরিক নির্যাতনকে অপরাধ মনে করলেও এই আক্রমণকে হালকাভাবে নেন। অথচ মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, শব্দের অপব্যবহার ক্ষত মানুষের অবচেতন মনে দীর্ঘদিন গেঁথে থাকে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়ে। এর নির্দিষ্ট কিছু প্রভাব উল্লেখ করা হলো-

বিশ্বাসের সংকট ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা : বারবার অপমানজনক কথা শুনলে একজন ব্যক্তির অন্যের প্রতি বিশ্বাস কমে যায় এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা বেড়ে যায়। অনেক সময় এর ফলে ব্যক্তি মধ্যে একাকীত্ব, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

আত্মমর্যাদার পতন ও হীনম্মন্যতা : অপমানজনক ভাষা ব্যক্তি বারবার শুনতে শুনতে একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনি আসলেই অযোগ্য, বোকা বা মূল্যহীন। এর ফলে তার আত্মমর্যাদাবোধ একেবারে কমে যায়।

অতিরিক্ত উদ্বেগ এবং ভয় : ট্রমার প্রভাবে মানুষ সবসময় একধরনের আতঙ্কে ভোগে। তিনি মনে করেন, কখন কার দিক থেকে আবার আঘাত আসবে। এই নিরাপত্তাহীনতা তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে।

আচরণগত পরিবর্তন : ট্রমাগ্রস্ত ব্যক্তি অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েন অথবা পুরোপুরি গুটিয়ে যান। সামান্য কথাতেই তারা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখান কিংবা পুরোপুরি কথা বলা কমিয়ে দেন।

সামাজিক সম্পর্কের ভাঙন : অপমানজনক কথা মানুষের সামাজিক সম্পর্কের উপর সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি সুস্থ সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহানুভূতি এবং নিরাপদ অনুভূতি। যখন কোনো সম্পর্কে এই আক্রমণ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়, তখন সেখানে সম্পর্কের ভাঙন অনিবার্য হয়ে ওঠে। শিশুরা এমন পরিবেশে বড় হলে তারাও মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার হয়।

বন্ধুত্ব ও কর্মক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতা : কর্মক্ষেত্রে বসের বা সহকর্মীর কটূক্তি কর্মচারীকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে তোলে, যা কাজের স্পৃহা ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। বন্ধুত্বের সম্পর্কে অহংকার ও টিপ্পনী বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।

অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের কারণ : কেন মানুষ অন্যকে হেয় করে কথা বলে? এর পেছনে কিছু নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ কাজ করে-

পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব : কিছু পরিবার বা সমাজে হেয় করে কথা বলাকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে মানুষ বুঝতেই পারে না যে এটি অন্যের জন্য ক্ষতিকর। আর যেসব পরিবারে নিয়মিত গালাগাল বা অপমানজনক ভাষা ব্যবহার হয়, সেখানে বেড়ে ওঠা শিশুরাও একই আচরণ শিখে।

আবার অনেক শিশু হয়তো পরিবার থেকে অপমানজনক ভাষা শেখে না; কিন্তু স্কুলে শিক্ষক, সহপাঠী বা বন্ধুদের কাছ থেকে এ ধরনের ভাষার ব্যবহার শিখতে পারে। এর ফলে শিশুর মধ্যে ধীরে ধীরে মানসিক অস্বস্তি, নেতিবাচক যোগাযোগের অভ্যাস, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং সহপাঠীদের প্রতি অসম্মান তৈরি হতে পারে।

আলবার্ট বান্দুরার সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ অন্যের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং তা অনুকরণের মাধ্যমে শেখে। তাই কোনো শিশু যদি পরিবার বা সমাজে নিয়মিত অপমানজনক ভাষা শুনে বড় হয়, তবে তার ভবিষ্যতেও একই ধরনের আচরণ করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।রাজনৈতিক আলোচনায় কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ : বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ, মতপার্থক্য এবং সামাজিক বিভাজন বর্তমানে মানুষের ভাষা ব্যবহারের ধরনকে প্রভাবিত করছে। যখন রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্তি ও তথ্যের পরিবর্তে আবেগ, বিরোধিতা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রাধান্য পায়, তখন অপমানজনক ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে আক্রমণাত্মক মন্তব্য এবং অপমানজনক শব্দের ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের অনলাইন সংস্কৃতি এই ভাষা ব্যবহারের ধরনকে প্রভাবিত করছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল স্ল্যাং, নতুন শব্দ, মিম, ইমোজি ও ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশভঙ্গি ডিজিটাল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। তবে এসব ভাষার অতিরিক্ত ও অসচেতন ব্যবহার অনেক সময় বাস্তব জীবনেও অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করছে।

বিশেষ করে যখন হাস্যরস বা মজার আড়ালে অন্যকে হেয় করা হচ্ছে, তখন তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। এর ফলে অপমানজনক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন তত্ত্ব (Follingstad, 2007)-অনুযায়ী, বারবার অপমান, অবজ্ঞা, নেতিবাচক মন্তব্য এবং মানসিক আঘাত ব্যক্তির আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সুস্থতাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যখন কোনো ব্যক্তিকে বারবার অবমূল্যায়ন করা হয়, তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় বা তার মতামত ও অনুভূতিকে গুরুত্বহীন করে দেখা হয়, তখন ধীরে ধীরে তার আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের সক্ষমতার প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

লুকানো হীনম্মন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতা : মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজের ভেতরে কোনো না কোনো ঘাটতি বা হীনম্মন্যতায় ভোগেন, তারা অন্যকে ছোট করে নিজের অবস্থানকে ওপরে তুলতে চান। এটি তাদের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ডিফেন্স মেকানিজম।

বর্তমানে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনক মন্তব্য, কটূক্তি ও সাইবার বুলিং এই মানসিক ও সামাজিক সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে। মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড অ্যাডলারের মতে, মানুষ যখন নিজের ভেতর কোনো দুর্বলতা অনুভব করে, তখন সে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মিথ্যা অহংকার তৈরি করে। অন্যকে হেয় করা আসলে এই কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনেরই একটি পথ। সহমর্মিতা ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার অভাব : শৈশবের পরিবেশ, পারিবারিক শিক্ষা কিংবা ব্যক্তিত্বের বিকাশগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মানুষের মধ্যে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা বা সহমর্মিতা পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠে না। ড্যানিয়েল গোলম্যানের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা তত্ত্ব (১৯৯৫) অনুযায়ী, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দক্ষতার অভাব মানুষের আচরণকে আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে।

ক্ষমতা ক্ষোভ ও হতাশার স্থানান্তর : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সম্পর্ক বা কর্মক্ষেত্রে অপর পক্ষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে বা চাপে রাখতে অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করে। আবার নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও অনেক সময় মানুষ অন্যকে অপমান করে কথা বলে। ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতা, কাজের চাপ বা জমে থাকা ক্ষোভ মানুষ নিরাপদ মনে হওয়া কোনো ব্যক্তির ওপর মৌখিক আক্রমণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এভাবে অপমানজনক ভাষা ব্যবহার ধীরে ধীরে অন্যকে হেয়প্রতিপন্ন করার আচরণে পরিণত হয়।

নেতিবাচক চিন্তাভাবনা ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি : জ্ঞানীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাস তার আচরণকে সরাসরি প্রভাবিত করে। যাদের মনে অন্যদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা, সন্দেহ বা বৈরী চিন্তা বেশি থাকে, তারা সহজেই অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করতে পারে। একইভাবে, যারা দীর্ঘদিন ধরে অপমানজনক কথা শুনতে শুনতে বড় হয়, তারা নিজের সম্পর্কেও নেতিবাচক বিশ্বাস গড়ে তোলে, যা তাদের আত্মসম্মান ও মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

উভয় পক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব : হেয় করে কথা বলা শুধু ভুক্তভোগীর ওপরই নয়, বরং যে ব্যক্তি এমন আচরণ করে তার ওপরও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। এটি ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের সুস্থ সম্পর্ককে দুর্বল করে এবং মানসিক সুস্থতার জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভুক্তভোগীর ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব : শব্দের মাধ্যমে বারবার অপমানিত হওয়া একজন মানুষের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে ব্যক্তির মধ্যে উদ্বেগ, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমাগত নেতিবাচক মন্তব্য দেখলে, দীর্ঘদিন অপমানের শিকার হলে অনেকের মধ্যে স্থায়ী ভয়, হীনম্মন্যতা ও মানসিক ট্রমা তৈরি হয়, যা কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতার রূপ নেয়।

এ ছাড়া ভুক্তভোগী সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারেন। লজ্জা, অপমান এবং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে তিনি পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের থেকে দূরে সরে যান। এর ফলে একাকীত্ব বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তারা পড়াশোনায় আগ্রহ হারাতে পারে, আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের নেতিবাচক আচরণ অন্যদের প্রতি প্রদর্শনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

অপমানজনক ভাষা ব্যবহারকারীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব : যে ব্যক্তি নিয়মিত অন্যকে অপমান বা হেয় করে কথা বলেন, তিনিও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন মানসিক ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। প্রথমদিকে এমন আচরণ তাকে সাময়িকভাবে ক্ষমতা বা আধিপত্যের অনুভূতি দিলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মানুষ তার প্রতি আস্থা হারায় এবং ধীরে ধীরে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে। এ ছাড়া অন্যকে আঘাত করার প্রবণতা ব্যক্তির নিজের মানসিক অস্থিরতাও বাড়িয়ে তোলে। রাগ, হিংসা, বিরক্তি ও নেতিবাচক চিন্তা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, যা তার মানসিক শান্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে। ফলে তিনি সুস্থ ও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন এবং ব্যক্তিগত জীবনেও অসন্তুষ্টি অনুভব করতে পারেন।

শব্দের এই সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসা এবং মনকে সুস্থ রাখার জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সচেতন প্রচেষ্টা এবং সঠিক মানসিক যত্নের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা : স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা চালু করা খুবই জরুরি। এছাড়াও স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিশুদের সাথে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে। তাদের সাথে ‘তুমি’ বা ‘আপনি’ সম্বোধন করে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার, সহমর্মিতা এবং সহনশীলতার শিক্ষা দিতে হবে। এতে শিশুর আত্মসম্মান বজায় থাকে এবং ইতিবাচক যোগাযোগের অভ্যাস তৈরি হয়।

সহমর্মিতা ও ইতিবাচক যোগাযোগের চর্চা : প্রথমত, সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং গঠনমূলক ও ইতিবাচক যোগাযোগ চর্চার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যিনি কথা বলছেন, তাকে নিজের ভাষা ও আচরণের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। কোনো কথা বলার আগে তা অন্যের মনে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোনো বিষয়ে রাগ বা ক্ষোভ থাকলে তা আক্রমণাত্মক ভাষায় প্রকাশ না করে নিজের অনুভূতির কথা শান্তভাবে প্রকাশ করার অভ্যাস করতে হবে।

সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি : সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধু, পরিবার, শিক্ষক, মসজিদ, মন্দির, গির্জা এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান যদি এসব বিষয়ে সচেতন হন এবং মানসিক সমর্থন দেন, তাহলে অপমানের নেতিবাচক মানসিক প্রভাব অনেকাংশেই কমে যায়। একই সঙ্গে, সমাজের প্রতিটি স্তরে সাইবার বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্য প্রতিরোধের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও সহনশীল পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব, যা তরুণ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল ও মানবিক করে তুলতে সাহায্য করবে।

কাউন্সিলিং ও সাইকোথেরাপি : মানসিক আঘাত মোকাবিলায় সাইকোলজিস্ট বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক কাউন্সিলিং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান এবং ইতিবাচক যোগাযোগের পরিবেশ গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। Cognitive Behavioral Therapy (CBT)-এর মাধ্যমে ভুক্তভোগী ব্যক্তির নেতিবাচক চিন্তা ও আত্মসন্দেহ কমাতে পারেন। একইভাবে, অপমানজনক ভাষা ব্যবহারকারী ব্যক্তি থেরাপির মাধ্যমে রাগ, হীনম্মন্যতা ও নেতিবাচক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে পারেন। গভীর শ্বাস নেওয়া, ধৈর্য ধরা এবং সমস্যা নিয়ে কাউন্সিলিং করার মাধ্যমে রাগ কমাতে সাহায্য করবে। শব্দের অপব্যবহার প্রতিরোধে সর্বপ্রথম সম্মানজনক ও সংযত ভাষা ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। রাগ বা আবেগের বশে হেয় করে কথা বলার পরিবর্তে ধৈর্য, সহানুভূতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক যোগাযোগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভদ্র ভাষা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং অপমানজনক ভাষা পরিহার করতে হবে। শব্দ যোগাযোগের একটি সৃজনশীল মাধ্যম। কিন্তু শব্দের অপব্যবহার কোনো সাধারণ আচরণ নয় এটি উভয় পক্ষের মানসিক সুস্থতার জন্যই ক্ষতিকর। ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে এটি আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে, অপব্যবহারকারীর ক্ষেত্রেও এটি মানসিক অস্থিরতা, সম্পর্কের অবনতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই শব্দকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে কখনো কাউকে হেয় করা উচিত নয়। একটি সুন্দর ও আন্তরিক বাক্য ভেঙে যাওয়া মনকে জোড়া লাগাতে পারে। তাই শারীরিক সহিংসতার মতো এই ধরণের মানসিক সহিংসতার বিরুদ্ধেও সমানভাবে সচেতন হতে হবে। এই সচেতনতা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সব স্তরে গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে ইতিবাচক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। সচেতনতা, ভালোবাসা ও অন্যের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাই পারে একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে।

ড. জেসান আরা

সহযোগী অধ্যাপক ও চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়