ব্যাংক খাতে দরকার সুশাসন

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণবিষয়ক সংকট নতুন নয়। ধীরে ধীরে এ সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এখন এ খাতটি খেলাপি ঋণ ছাড়াও একাধিক সংকটে পতিত হয়েছে। ব্যাংক খাতে উদ্ভূত পরিস্থিতি শুধু ব্যাংক নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিরই একটি অশুভ বার্তা দেয়। এ পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ৩১ মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি। একই সময়ে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ-সংবলিত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখের বেশি। ১ বছর আগে একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২১ লাখের কিছু বেশি। তার মানে মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি হিসাব দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। শুধু তাই নয়, আগে যেখানে এসব হিসাবের বড় অংশই ছিল করপোরেট বা বড় শিল্প, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের।

এখন সাধারণ গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এসএমই উদ্যোক্তা, কৃষক এবং ব্যক্তিগত ঋণগ্রহীতাও রয়েছে বেড়েছে, যাকে অর্থনীতিবিদরা অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। খেলাপি ঋণের সঙ্গে খাতটির আরেকটি বড় সংকট হচ্ছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক পরিচালনায় দুর্বলতা। এ ছাড়া সাধারণ গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়া। পাশাপাশি বিদ্যমান সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স আটকে থাকা। দায়ী পরিচালকদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান। সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক খাত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, অনিয়ম তদন্ত, বিশেষ নিরীক্ষার পাশাপাশি নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো এবং আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন।

খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নতুন কিছু নয়। বিগত সরকারগুলোর সময় শুধু খেলাপি ঋণ নয়, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাংকটির তৎপরতার কথা সবার জানা। বহু আইন হয়েছে। বারবার আনা হয়েছে নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন। কিন্তু সবচেয়ে যেটা জরুরি, অর্থাৎ সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ বিতরণ এবং একটি কার্যকর ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো জরুরি কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

এক্ষেত্রে প্রতিটি সরকার বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তাদের দায় এড়াতে পারে না। কেননা, রাজনৈতিক প্রভাবেই বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে বিরাট বিরাট ঋণ প্রদান করা হয়। অর্থ পাচারের তালিকায় এদেরই নাম থাকে। আর এদেরই বড় একটি অংশ হয় খেলাপি। এসবের ফলই আজকের ব্যাংক খাতের সংকট। এ মুহূর্তে ক্ষুদ্র পর্যায়ে খেলাপির সংখ্যা বৃদ্ধি সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

আমরা মনে করি, ব্যাংক খাতের সংকট নিরসন এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সবার আগে দরকার খাতটিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন, নীতিমালা পরিবর্তন তো বটেই, আবশ্যক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। কেননা, খাতটির অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক প্রভাবই অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে বিদ্যমান আইন-নীতিমালা বাস্তবায়নের। আমরা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতাকে সাধুবাদ জানাই এবং বিশ্বাস করতে চাই, তারা সত্যিকারই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সফল হবেন।