রবীন্দ্রনাথের প্রস্থান, আমাদের চিরন্তন আলোর দিকে ফিরে দেখা

বিল্লাল বিন কাশেম

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২২ শ্রাবণ ছিল বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক গভীর বিষাদের দিন। এ দিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ, ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে থেমে গিয়েছিল বাংলা ভাষার এক অনন্য কণ্ঠস্বর। থেমেছিল একটি শরীরের জীবন; কিন্তু থামেনি তার সৃষ্টি। থামেনি তার গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠি, শিক্ষা-ভাবনা, মানবতাবাদ কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের সেই অনন্ত সংলাপ।

রবীন্দ্রনাথ চলে গেছেন ৮৫ বছর আগে। কিন্তু আজও বাঙালির আনন্দে তার গান আছে, বিষাদে তার কবিতা আছে, প্রেমে তার ভাষা আছে, প্রকৃতির কাছে গেলে তার অনুভব আছে, জাতীয় জীবনের সংকটে তার চিন্তা আছে, শিশুর প্রথম পাঠে তার ছায়া আছে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে তার প্রার্থনা আছে। তিনি যেন আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের এমন এক অংশ, যাকে বাদ দিয়ে বাঙালিকে সম্পূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। ২২ শ্রাবণ তাই শুধু একজন কবির মৃত্যুদিন নয়; এটি আমাদের নিজেদের কাছে ফিরে আসার দিন। আমরা কী পড়ছি, কী ভাবছি, কীভাবে মানুষকে দেখছি, কীভাবে প্রকৃতিকে দেখছি, কী ধরনের সমাজ নির্মাণ করতে চাই- এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে নিয়ে আসে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ দিবস।

অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আজ কবিগুরুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

তিনি শুধু কবি নন, একটি সভ্যতার নাম-

রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবি বললে তার ব্যাপ্তিকে ছোট করে দেখা হয়। তিনি ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাচিন্তক, চিত্রশিল্পী, সমাজভাবুক এবং সর্বোপরি একজন গভীর মানবতাবাদী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক রূপ নির্মাণে তাঁর অবদান এত ব্যাপক যে, তাঁর আগে ও পরে বাংলা সাহিত্যকে আলাদা করে দেখা যায়। তিনি বাংলা কবিতাকে নতুন ভাষা দিয়েছেন, গানে নতুন সুর দিয়েছেন, ছোটগল্পকে স্বতন্ত্র শিল্পরূপ দিয়েছেন, উপন্যাসে মানুষের অন্তর্জগতকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন এবং নাটকে নতুন ভাবনার দ্বার খুলেছেন।

‘গীতাঞ্জলি’ তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে পৌঁছে দেয়। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু নিজেকে নয়, বাংলা ভাষাকেও বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে নতুন মর্যাদা এনে দেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পুরস্কার নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো- তিনি মানুষের হৃদয়ের ভাষাকে এমনভাবে উচ্চারণ করেছেন, যা সময় ও ভূগোলের সীমানা অতিক্রম করেছে।

তাঁর কবিতার প্রেম যেমন ব্যক্তিগত, তেমনি সার্বজনীন। তাঁর প্রকৃতিচেতনা যেমন বাংলার মাটি ও নদীকে ধারণ করে, তেমনি তা মানুষের অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর দেশপ্রেম যেমন মাটির প্রতি ভালোবাসা, তেমনি অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেও এক গভীর সতর্কতা। এই বহুমাত্রিকতাই রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ করেছে। বাঙালির জীবনের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। শিশুর মুখে যখন প্রথম কবিতা আসে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ। তরুণ-তরুণীর প্রেমে তাঁর গান। বর্ষার দিনে তাঁর প্রকৃতির কবিতা। শরতের আকাশে তাঁর গান। বসন্তে তাঁর উৎসব। পূজার প্রার্থনায় তাঁর ভক্তিমূলক রচনা। বিচ্ছেদের রাতে তাঁর কবিতা। মৃত্যুর মুহূর্তে তাঁর শান্ত, গভীর দর্শন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবনের যে দীর্ঘ যাত্রা- রবীন্দ্রনাথ তার প্রায় প্রতিটি বাঁকে উপস্থিত। এই উপস্থিতি কোনো আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নয়। এটি হৃদয়ের উপস্থিতি। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ তাঁরই সৃষ্টি। এই একটি গানই প্রমাণ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ কতটা গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর গান একাত্ম হয়ে আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর গান বাঙালির আত্মপরিচয়, সাহস ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে তাই রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করা মানে শুধু সাহিত্যিককে স্মরণ করা নয়; নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে স্মরণ করা। ‘আমার সোনার বাংলা’ থেকে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়-

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত শুধু একটি গান নয়। এটি একটি জাতির আবেগ, মাটি, প্রকৃতি, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের সংগীত। ‘আমার সোনার বাংলা’য় যে বাংলাদেশকে আমরা দেখি, সেখানে আছে ধানের ক্ষেত, নদী, বাতাস, কৃষকের জীবন, বাংলার প্রকৃতি এবং মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমতা।

এই গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়- দেশ শুধু একটি মানচিত্র নয়। দেশ মানুষের অনুভূতি। দেশ মায়ের মতো। দেশ মাটির গন্ধ, নদীর জল, ফসলের মাঠ, গ্রামের পথ, শরতের আকাশ, বর্ষার বৃষ্টি এবং মানুষের ভালোবাসার সমষ্টি। রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম তাই মানুষের সঙ্গে প্রকৃতিকে আলাদা করে দেখেনি। আজ যখন নগরায়ণ, পরিবেশদূষণ, নদী দখল, জলাশয় ভরাট ও বৃক্ষনিধনের কারণে বাংলাদেশের প্রকৃতি ক্রমেই বিপন্ন, তখন রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিচেতনা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমরা যদি সত্যিই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তাহলে শুধু ফুল দিয়ে তাঁর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানালেই হবে না। আমাদের নদী বাঁচাতে হবে, বৃক্ষ রক্ষা করতে হবে, জলাশয় রক্ষা করতে হবে, গ্রামীণ প্রকৃতি সংরক্ষণ করতে হবে। কারণ রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তাঁর কবিতা পড়া নয়; তার ভালোবাসার পৃথিবীটাকেও ভালোবাসা। মানুষের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা- রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পাঠ করলে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে- মানুষের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা। তিনি মানুষের দুর্বলতা দেখেছেন, মানুষের লোভ দেখেছেন, সংকীর্ণতা দেখেছেন, সামাজিক বৈষম্য দেখেছেন, ধর্মীয় গোঁড়ামি দেখেছেন; কিন্তু তারপরও মানুষের সম্ভাবনার ওপর থেকে আস্থা হারাননি। তাঁর মানবতাবাদ কোনো বিমূর্ত দর্শন ছিল না। মানুষের দুঃখ, বঞ্চনা, একাকিত্ব, প্রেম, ব্যর্থতা ও আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়েই তিনি মানুষকে দেখেছেন। ‘গোরা’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘চোখের বালি’, ‘যোগাযোগ’, ‘শেষের কবিতা’- তার উপন্যাসগুলোর চরিত্রগুলো আজও আমাদের সামনে জীবন্ত। তারা শুধু অতীতের মানুষ নয়; তারা আমাদের সমাজেরই মানুষ। তাদের দ্বন্দ্ব, প্রেম, অহংকার, সংকট ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন আজও আমাদের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। ‘কাবুলিওয়ালা’ কিংবা ‘পোস্টমাস্টার’-এর মতো ছোটগল্পে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের যে সূক্ষ্ম আবেগ তিনি তুলে ধরেছেন, তা আজও পাঠককে স্পর্শ করে। এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ কখনও পুরোনো হয়ে যান না। নারীকে দেখার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের আধুনিকতা- রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নারীর মনোজগতকে বাংলা সাহিত্যে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে। বিনোদিনী, চারুলতা, বিমলা, কুমুদিনীসহ তাঁর বহু নারী চরিত্র কেবল গল্পের অংশ নয়; তারা নিজেদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, বুদ্ধি, আবেগ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ।

তাঁর সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় নারীর স্বাধীনতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ নারীর অন্তর্জগতকে সাহিত্যে যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

তাঁর নারী চরিত্রগুলো আমাদের শেখায়- নারীকে শুধু স্ত্রী, মা, কন্যা কিংবা পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখলে মানুষের অর্ধেক পৃথিবীকে অসম্পূর্ণভাবে দেখা হয়। নারীর নিজস্ব সত্তা আছে। তাঁর স্বপ্ন আছে। তাঁর সিদ্ধান্ত আছে। তাঁর আত্মমর্যাদা আছে। আজও যখন নারীর অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্ন রয়েছে, তখন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য আমাদের ভাবতে শেখায়।

শিক্ষা নিয়ে তাঁর স্বপ্ন- রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপায় হিসেবে দেখেননি। তিনি মনে করতেন শিক্ষা মানুষের মনকে মুক্ত করবে। শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল এমন একটি শিক্ষাদর্শ, যেখানে প্রকৃতি, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চা একে অপরের পরিপূরক। আজকের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথের সেই ভাবনা নতুন করে মনে পড়ে।

আমরা শিক্ষাকে অনেক সময় সনদ, চাকরি এবং প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। শিশুর কৌতূহল কোথায়? সৃজনশীলতা কোথায়? প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক কোথায়? শিল্প, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের জায়গা কোথায়? একজন শিক্ষার্থী যদি অসংখ্য তথ্য মুখস্থ করতে পারে কিন্তু একজন অসহায় মানুষকে সম্মান করতে না শেখে, তবে সেই শিক্ষা কতটা পূর্ণ? রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ আমাদের এই প্রশ্নটি করতে শেখায়।

স্বাধীন চিন্তার কবি- রবীন্দ্রনাথ ছিলেন স্বাধীন চিন্তার মানুষ। তিনি কোনো অন্ধ মতবাদকে গ্রহণ করেননি। নিজের সমাজকেও প্রশ্ন করেছেন, নিজের সময়কেও প্রশ্ন করেছেন। ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইটহুড ত্যাগ করেন। এটি ছিল তাঁর নৈতিক অবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। কিন্তু তাঁর প্রতিবাদ ছিল না ঘৃণার ভাষায়। তিনি মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এখানেই রবীন্দ্রনাথের শক্তি। তিনি আমাদের শেখান- দেশকে ভালোবাসতে হলে প্রশ্ন করতে হয়। সমাজকে ভালোবাসতে হলে তার ভুলের সমালোচনা করতে হয়। মানুষের কল্যাণ চাইলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। অন্ধ আনুগত্য কখনও সত্যিকারের দেশপ্রেম হতে পারে না। ধর্মের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি- রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য গভীর আধ্যাত্মিকতায় সমৃদ্ধ। কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিকতা সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। তিনি মানুষের মধ্যে ঈশ্বরীয় সম্ভাবনা দেখেছেন। মানুষের সেবা, ভালোবাসা ও মর্যাদাকে ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বাংলার সমাজ বহু ধর্ম, মত ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানের সমাজ। এই বাস্তবতায় রবীন্দ্রনাথের মানবিক ধর্মবোধ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকের পৃথিবীতে যখন ধর্মের নামে বিভাজন, ঘৃণা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে, তখন রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ধর্ম মানুষের মধ্যে দেয়াল তৈরির জন্য নয়; মানুষকে সত্য, সৌন্দর্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা- বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে শুধু বইয়ের পাতায় ধারণ করেনি। এ দেশের প্রকৃতি, নদী, গ্রাম, কৃষিজীবন ও মানুষের অনুভূতির সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের দিনগুলো তাঁর সাহিত্যজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পদ্মার তীর, গ্রামীণ জীবন, কৃষক, সাধারণ মানুষ- এসব তাঁর সৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করেছে। আজও বাংলাদেশের গ্রামবাংলায় তাঁর অনেক কবিতা ও গান মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, নতুন প্রজন্মের একটি অংশ রবীন্দ্রনাথকে শুধু পরীক্ষার প্রশ্ন হিসেবে জানে। তাঁর সাহিত্য পাঠের বদলে অনেক সময় তাঁর রচনার সারাংশ মুখস্থ করা হয়। এভাবে রবীন্দ্রনাথকে জানা যায় না। রবীন্দ্রনাথকে জানতে হলে তাঁকে পড়তে হবে। শুধু ‘সোনার তরী’ নয়, ‘গীতাঞ্জলি’ পড়তে হবে। শুধু ‘শেষের কবিতা’ নয়, ‘গোরা’ পড়তে হবে। শুধু ‘সোনার বাংলা’ গাওয়া নয়, তাঁর প্রবন্ধ ও চিঠিপত্র পড়তে হবে। তাঁর জীবন, শিক্ষা, সমাজভাবনা ও মানবতাবাদ বুঝতে হবে। তবেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে জীবন্ত হয়ে উঠবেন। ডিজিটাল যুগে রবীন্দ্রনাথ- আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একটি মোবাইল ফোনের পর্দায় পৃথিবী এসে হাজির হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিনোদন ও দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহ মানুষের চিন্তার ধরন বদলে দিচ্ছে। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে পড়ানোর প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ তথ্যের আধিক্য মানুষকে জ্ঞানী করে না। জ্ঞান মানুষকে গভীর করে, আর সাহিত্য মানুষকে মানবিক করে। ডিজিটাল প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথকে পৌঁছে দিতে হলে শুধু পুরোনো পদ্ধতিতে বই প্রকাশ করলেই হবে না। তাঁর সাহিত্যকে ডিজিটাল লাইব্রেরিতে সহজলভ্য করতে হবে। অডিওবুক, পডকাস্ট, নাট্যরূপ, অ্যানিমেশন, ডকুমেন্টারি, ইন্টার্যাকটিভ শিক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভাষা-প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁর রচনা নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন রবীন্দ্রনাথের বিকল্প না হয়; প্রযুক্তি হোক রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছানোর সেতু। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্কের প্রয়োজন আছে- রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা করার অর্থ তাঁকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা নয়। বরং একজন বড় লেখককে ভালোভাবে বোঝার জন্য তাঁর সঙ্গে বিতর্ক করতে হয়, তাঁর সময়কে বুঝতে হয়, তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতাও বিশ্লেষণ করতে হয়। তাঁর সাহিত্য নিয়ে নতুন গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর নারীচিন্তা, কৃষকভাবনা, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, অর্থনৈতিক চিন্তা, শিক্ষাদর্শ, পরিবেশচেতনা, ধর্মবোধ এবং আধুনিকতার ধারণা নিয়ে নতুন প্রজন্মের গবেষকদের কাজ করা দরকার। কারণ রবীন্দ্রনাথকে যত পড়া হবে, তত নতুন রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কৃত হবে। এটাই বড় সাহিত্যিকের বৈশিষ্ট্য। আজকের সমাজে রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় শিক্ষা- মানুষ হওয়া আমাদের সময় অস্থির। চারদিকে প্রতিযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শনের প্রবণতা। রাজনৈতিক বিভাজন। সামাজিক অবিশ্বাস। অর্থনৈতিক বৈষম্য। পরিবেশের সংকট। তরুণদের মধ্যে হতাশা। পরিবারে দূরত্ব। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ক্রমেই যেন যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সবচেয়ে বড় যে কথাটি বলতে পারেন, তা হলো- মানুষ হও। মানুষকে ভালোবাসো। প্রকৃতিকে ভালোবাসো। সৌন্দর্যকে অনুভব করো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও। নিজেকে প্রশ্ন করো। শিক্ষাকে শুধু চাকরির সিঁড়ি বানিও না। দেশকে ভালোবাসো, কিন্তু মানুষকে ভুলে নয়। ধর্মকে ধারণ করো, কিন্তু ঘৃণাকে নয়। স্বাধীনতাকে ভালোবাসো, কিন্তু অন্যের স্বাধীনতা অস্বীকার করে নয়। এই মানবিক শিক্ষা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

নীরব প্রার্থনা : রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণের দিনে আমরা প্রতি বছর তাঁকে স্মরণ করি। ফুল দিই, গান গাই, কবিতা পাঠ করি, আলোচনা সভা করি। এসব প্রয়োজনীয়। কিন্তু এর চেয়েও প্রয়োজনীয় হলো- তাঁর চিন্তাকে জীবনে ধারণ করা। রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হতে পারে একটি ভালো বই পড়া।একটি শিশুকে বই উপহার দেওয়া। একটি গাছ লাগানো। একজন দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। একজন ভিন্নমতের মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়া। নিজের ভাষাকে ভালোবাসা। বাংলার প্রকৃতিকে রক্ষা করা। মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করা। তবেই ২২ শ্রাবণের স্মরণ সত্যিকারের অর্থ পাবে। কারণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়েছে; কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলোর মৃত্যু হয়নি। তাঁর স্বপ্নের মৃত্যু হয়নি। তাঁর মানুষের প্রতি আস্থা শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর গানের সুর থেমে যায়নি। আকাশে হয়তো মেঘ আছে। কোথাও হয়তো বৃষ্টি নামছে। বাংলার কোনো নদীর পাড়ে কাশফুল দুলছে। কোনো গ্রামের উঠানে শিশুরা খেলছে। কোনো তরুণ একা বসে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ছে। কোনো মঞ্চে তাঁর গান গাওয়া হচ্ছে। কোনো ঘরে একজন বৃদ্ধ তাঁর পুরোনো বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ নেই- কিন্তু তিনি আছেন। আছেন আমাদের ভাষায়। আছেন আমাদের গানে। আছেন আমাদের জাতীয় সংগীতে। আছেন আমাদের প্রেমে। আছেন আমাদের প্রকৃতিতে। আছেন আমাদের স্মৃতিতে। আছেন আমাদের আত্মপরিচয়ে।

একজন মানুষের শরীরের মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের সৃষ্টিশীল মানুষের মৃত্যু হয় না। রবীন্দ্রনাথ সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা মৃত্যুর পরও ক্রমাগত জন্ম নিতে থাকেন- প্রতিটি নতুন পাঠকের মনে, প্রতিটি নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে, প্রতিটি নতুন ব্যাখ্যায়। তাই ২২ শ্রাবণ আমাদের কাছে কেবল শোকের দিন নয়। এটি পুনরাবিষ্কারের দিন।

আজ আমরা কবিগুরুকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এবং নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখি- আমরা কি সত্যিই রবীন্দ্রনাথকে পড়েছি? নাকি শুধু তাঁকে উদযাপন করেছি? যদি তাঁর সাহিত্য আমাদের হৃদয়কে একটু কোমল করে, চিন্তাকে একটু স্বাধীন করে, মানুষকে একটু বেশি ভালোবাসতে শেখায়, প্রকৃতিকে একটু বেশি আপন করে এবং অন্যায়ের সামনে একটু বেশি সাহসী করে* তবেই তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা সার্থক হবে। ২২ শ্রাবণে তাই কবিগুরুর প্রতি রইল অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা সেই কবিকে, যিনি বাঙালিকে তার নিজের ভাষার সৌন্দর্য চিনিয়েছেন। শ্রদ্ধা সেই মানুষকে, যিনি বিশ্বমানবতার স্বপ্ন দেখেছেন। শ্রদ্ধা সেই স্রষ্টাকে, যাঁর কলমে বাংলা ভাষা পেয়েছে এক অনন্ত আকাশ।

বিল্লাল বিন কাশেম

লেখক : কবি, গল্পকার ও গণসংযোগবিদ।