তীব্র তাপ ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকিতে দেশ

সমীরণ বিশ্বাস

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও দ্রুত বিস্তার লাভকারী প্রভাবগুলোর একটি হলো তীব্র তাপপ্রবাহ। এক দশকে বিশ্বজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক উষ্ণতম বছর প্রত্যক্ষ করা গেছে, আর বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘস্থায়ী ও অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ কৃষি, শ্রম, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষ করে দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা আয়ের বড় অংশ হারাচ্ছেন, কারণ অতিরিক্ত তাপের কারণে কাজের সময় ও উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ফসলের ফলন হ্রাস, সেচ ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত ব্যয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ুজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বহু মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে তীব্র তাপ এখন শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি উন্নয়নগত সংকটে পরিণত হয়েছে।

তাই তাপপ্রবাহ মোকাবিলাকে জলবায়ু অভিযোজনের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা সময়ের দাবি। বাংলাদেশে গ্রীষ্ম আর শুধু একটি ঋতু নয়; এটি ধীরে ধীরে অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য এক নীরব সংকটে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, রেকর্ড তাপমাত্রা এবং উচ্চ আর্দ্রতার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। একসময় যে তাপপ্রবাহকে ব্যতিক্রমী ঘটনা মনে করা হতো, আজ তা প্রায় নিয়মিত বাস্তবতা। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই বাড়াবে না, বরং শ্রমঘণ্টা কমিয়ে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, আয় কমে যাওয়া এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির মতো বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশে উচ্চ তাপমাত্রা এরইমধ্যে স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ এখনও কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন ও অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। এসব খাতে অধিকাংশ শ্রমিককে খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয়। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করা তাদের জন্য শুধু কষ্টকর নয়, অনেক ক্ষেত্রে জীবনহানিকরও। ফলে কাজের সময় কমে যায়, উৎপাদন কমে যায় এবং দৈনিক আয় হ্রাস পায়। দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক কিংবা নির্মাণশ্রমিক, তাদের কাছে প্রতিটি হারানো কর্মঘণ্টা মানে পরিবারের খাবারের থালা ছোট হয়ে যাওয়া। বিশ্বব্যাংকের মতে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ হচ্ছে। একই সঙ্গে তাপজনিত অসুস্থতা, চিকিৎসা ব্যয় এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে কৃষিতে। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি ও ফল উৎপাদনে অতিরিক্ত তাপের প্রভাব এরইমধ্যে দৃশ্যমান। উচ্চ তাপমাত্রায় পরাগায়ন ব্যাহত হয়, ফলন কমে, মাটির আর্দ্রতা দ্রুত হ্রাস পায় এবং সেচের চাহিদা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়তি চাপ। বাংলাদেশের কৃষিকে তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানোর নয়, জলবায়ু-সহনশীল করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। জল-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এআই কৃষি পরামর্শ, IoT-ভিত্তিক মাটি পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা এবং তাপসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন এখন আর বিলাসিতা নয়, এগুলো অপরিহার্য বিনিয়োগ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়লে ঢাকার এ ক্ষতি আরও বাড়বে। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ হবে, এমন আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। ২০৮০ সালে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান। তখন তাপের কারণে কর্মঘণ্টা হারানোর হার বেড়ে হবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। তীব্র তাপ শুধু শরীর নয়, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অতিরিক্ত তাপে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ও কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা বৃদ্ধি পায়। প্রতিবেদন বলছে, উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি উভয়ই বাড়ছে এবং এর ফলে কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কংক্রিটের বিস্তার, জলাধার ভরাট এবং সবুজায়নের অভাবে শহরে ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় আরও বেশি অনুভূত হয়। ঢাকার মতো মহানগরে এ সমস্যা এরইমধ্যে জনস্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

দারিদ্র্য ও তাপপ্রবাহের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। দরিদ্র মানুষের বসবাস সাধারণত টিনের ঘর বা অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলসম্পন্ন বাসস্থানে। তাদের অধিকাংশের পক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার সম্ভব নয়। ফলে তাপপ্রবাহের সময় তারা একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি, আয়হানি এবং অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের মুখোমুখি হন। জলবায়ু পরিবর্তন এভাবেই সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তোলে।

বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার বলছে, অভিযোজনে বিনিয়োগ এখন ব্যয় নয়; এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল জনগোষ্ঠী আগামী বছরগুলোয় চরম তাপের ঝুঁকিতে থাকবে, যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়। বাংলাদেশের জন্য এখন জরুরি কয়েকটি পদক্ষেপ হলো, জাতীয় পর্যায়ে হিট অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন, শহরে সবুজায়ন ও জলাধার সংরক্ষণ, শ্রমিকদের জন্য তাপ-নিরাপদ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, বিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রে তাপঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। পাশাপাশি গবেষণা, তথ্যভিত্তিক নীতি এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে জলবায়ু অভিযোজনকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারায় আনতে হবে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, তাপপ্রবাহ শুধু একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়; এটি উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আজকের সঠিক সিদ্ধান্ত আগামী দিনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে। আর যদি আমরা এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তবে তীব্র তাপ শুধু মানুষের শরীরই নয়, বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকেও দুর্বল করে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পরিবেশ রক্ষার লড়াই নয়; এটি দারিদ্র্য প্রতিরোধ, মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের লড়াই। এখনই সময়, তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে নয়, জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করার।

তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব মোকাবিলা শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দারিদ্র্য হ্রাসের জন্যও অপরিহার্য। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাপসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, নগরাঞ্চলে সবুজায়ন বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কৃষিতে জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি ও স্মার্ট চাষাবাদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু অর্থায়ন আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম হলেও সময়োপযোগী পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি এবং জনসম্পৃক্ত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। তীব্র তাপকে যদি এখনই উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনা না হয়, তবে দারিদ্র্য হ্রাসে অর্জিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই আজকের কার্যকর বিনিয়োগ, সচেতনতা ও নীতিগত পদক্ষেপই আগামী দিনের নিরাপদ, সহনশীল এবং টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলবে।

সমীরণ বিশ্বাস

লেখক : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ।