শুধু সঞ্চয় নয়, দরকার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিনিয়োগ

সাইফুল হোসেন

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় বাংলাদেশে টাকা জমিয়ে রাখার সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল ব্যাংক। চাকরির বেতন এলেই অনেকে ডিপিএস, এফডিআর বা সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা জমা রাখতেন। কারণ ব্যাংককে নিরাপদ মনে করা হতো এবং অধিকাংশ মানুষের কাছে এটিই ছিল একমাত্র পরিচিত সঞ্চয়ব্যবস্থা। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট, পুনর্গঠন এবং গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন নিয়ে উদ্বেগের ঘটনাগুলো অনেক মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এখন অনেকেই জানতে চাইছেন- ব্যাংকের বাইরে এমন কোনো জায়গা আছে কি, যেখানে টাকা তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে এবং সময়ের সঙ্গে মূল্যও বাড়বে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে একটি বাস্তবতা বুঝতে হবে। শুধু টাকা জমিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়; সেই টাকার ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখাও জরুরি। কারণ মূল্যস্ফীতির কারণে আজকের ১ লাখ টাকার মূল্য কয়েক বছর পর আর একই থাকবে না। Bangladesh Bureau of Statistics (BBS)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ৮-১০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। অর্থাৎ, আপনার সঞ্চয় যদি এর চেয়ে কম হারে বাড়ে, তাহলে প্রকৃত অর্থে আপনি লাভ করছেন না; বরং আপনার অর্থের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমছে।

এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক গবেষণাও সমর্থন করে। International Monetary Fund বলছে, দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে নগদ অর্থ বা কম রিটার্নের সঞ্চয়ে অর্থ ধরে রাখলে প্রকৃত সম্পদ কমে যায়। একইভাবে World Bank উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গঠনে বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ (Diversification)-এর ওপর জোর দিয়েছে। বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী Warren Buffett বলেছেন, Risk comes from not knowing what youÕre doing. অর্থাৎ, বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বাজার নয়; বরং না বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আবার তিনি আরও বলেছেন, The stock market is a device for transferring money from the impatient to the patient. অর্থাৎ, ধৈর্যশীল বিনিয়োগকারীরাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন। বাংলাদেশে ব্যাংকের বাইরে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হলো সঞ্চয়পত্র। এটি মূলত সরকারের কাছে অর্থ ঋণ দেওয়ার একটি ব্যবস্থা। ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশ সরকার সঞ্চয়পত্রের মূলধন ও নির্ধারিত মুনাফা পরিশোধে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। তাই যারা কম ঝুঁকিতে স্থিতিশীল আয় চান, তাদের জন্য এটি এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুনাফার হার ও বিনিয়োগের নিয়মে পরিবর্তন এসেছে, তবুও নিরাপত্তার দিক থেকে এটি অনেকের আস্থার জায়গা। এ ছাড়া বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অংশ নিতে পারেন। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিতে সরকারি বন্ডকে সবচেয়ে নিরাপদ সম্পদগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এগুলোর পেছনে সরকারের দায়বদ্ধতা থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ অনেক দেশের অবসর তহবিল ও পেনশন ফান্ডের বড় অংশই সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করা থাকে। যারা কিছুটা বেশি রিটার্ন চান, কিন্তু সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তাদের জন্য মিউচুয়াল ফান্ড একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এখানে একজন দক্ষ ফান্ড ম্যানেজার বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে ঝুঁকি ভাগ করে দেন। বিশ্বের বৃহত্তম বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত বিনিয়োগ করলে ভালো মানের বৈচিত্র্যময় ফান্ড অনেক বিনিয়োগকারীর সম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে বিনিয়োগের আগে অবশ্যই ফান্ডের অতীত পারফরম্যান্স, ফান্ড ম্যানেজারের দক্ষতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন যাচাই করা জরুরি। বাংলাদেশে জমি ও রিয়েল এস্টেটও দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় বিনিয়োগমাধ্যম। বিশেষ করে পরিকল্পিত উন্নয়ন এলাকায় দীর্ঘমেয়াদে জমির মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই বেড়েছে। তবে এই খাতে ঝুঁকিও কম নয়। জাল দলিল, মালিকানা বিরোধ, অনুমোদনের সমস্যা এবং আইনি জটিলতা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তাই জমি কেনার আগে আইনজীবীর মাধ্যমে দলিল ও মালিকানা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেয়ারবাজার নিয়ে অনেকের ভয় থাকলেও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Morningstar এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান Vanguard-এর দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শক্তিশালী কোম্পানির শেয়ারে দীর্ঘ সময় বিনিয়োগ সাধারণত মূল্যস্ফীতিকে হারানোর সম্ভাবনা তৈরি করে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে শেয়ারবাজারে কখনো লোকসান হয় না। বরং স্বল্পমেয়াদে ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে ভালো কোম্পানির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিনিয়োগকারীর সম্পদও বাড়তে পারে। মূল্যভিত্তিক বিনিয়োগের জনক Benjamin Graham বলেছিলেন, The individual investor should act consistently as an investor and not as a speculator. অর্থাৎ, বিনিয়োগকারীর লক্ষ্য হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গঠন, দ্রুত লাভের আশায় জল্পনা-কল্পনা নয়।

স্বর্ণও দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ সম্পদ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ বা আর্থিক সংকটের সময় অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। World Gold Council-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে স্বর্ণের একটি সীমিত অংশ রাখা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। যদিও স্বর্ণ থেকে নিয়মিত আয় আসে না, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মূল্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, সবচেয়ে বেশি রিটার্ন পাওয়া যায় নিজের দক্ষতার ওপর বিনিয়োগ করলে। Warren Buffett-এর আরেকটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য হলো, The best invest ment you can make is in yourself. নতুন দক্ষতা শেখা, একটি পেশাগত কোর্স করা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করা কিংবা ছোট একটি ব্যবসা শুরু করা- এসবই ভবিষ্যতের আয়ের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এ বিষয়টি World Economic Forum-এর Future of Jobs Report ২০২৫-এও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং অটোমেশনের কারণে কর্মক্ষেত্র দ্রুত বদলাবে। ফলে যারা নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জন করবেন, তারাই আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নীতি পৃথিবীর সব বড় বিনিয়োগকারীরাই মেনে চলেন- Diversification বা বৈচিত্র্য। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ Harry Markowity যিনি আধুনিক পোর্টফোলিও তত্ত্বের প্রবর্তক, বলেছিলেন, Diversification is the only free lunch in investing. অর্থাৎ, ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিনিয়োগকে বিভিন্ন খাতে ভাগ করে দেওয়া। একই দর্শন থেকে এসেছে বহুল পরিচিত প্রবাদ- DonÕt put all your eggs in one basket. সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- কোনো বিনিয়োগই শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তথ্য সংগ্রহ করুন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন যাচাই করুন এবং নিজের আর্থিক লক্ষ্য, বয়স, ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা ও সময় বিবেচনা করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব বা দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভনে নয়, বরং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কারণ, শেষ পর্যন্ত আপনার অর্থের সবচেয়ে বড় অভিভাবক ব্যাংক, বাজার বা অন্য কেউ নয়- আপনি নিজেই।

সাইফুল হোসেন

লেখক : কর্পোরেট ট্রেইনার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি