যুদ্ধের মুনাফা, কর্পোরেট লুট এবং তৃতীয় বিশ্ব
ফারুক যোশী
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
যুদ্ধ কেবল রাষ্ট্রের মধ্যে অস্ত্রের সংঘর্ষ নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির শক্তির ভারসাম্যও পুনর্নির্ধারণ করে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, প্রতিটি বড় যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংকটের আড়ালে কিছু গোষ্ঠী বিপুল অর্থনৈতিক লাভের সুযোগ খুঁজে নেয়। ২০২৬ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত তার আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার সুযোগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। আর সেই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়েছে বিশ্বের বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলো, যখন সাধারণ মানুষকে বহন করতে হয়েছে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ভার। সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি বিপি (BP) ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা করেছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একই সময়ে শেল (Shell) প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিট মুনাফা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল উইটনেস (Global Witness) এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, BP, Shell, TotalEnergies, ExxonMobil Ges Chevron-এই পাঁচটি বৃহৎ তেল কোম্পানি মাত্র তিন মাসে সম্মিলিতভাবে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মুনাফা করেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৫৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, প্রতি ঘণ্টায় ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬ হাজার মার্কিন ডলার লাভ তাদের কোষাগারে জমা হয়েছে। ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের পর এটিই ছিল তাদের সবচেয়ে লাভজনক প্রান্তিক। প্রশ্ন হলো, এ বিপুল মুনাফা কোথা থেকে এলো? এর উত্তর নিহিত রয়েছে পুঁজিবাদী বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামোয়। যুদ্ধের কারণে সরবরাহে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় একই হারে বাড়ে না। ফলে অতিরিক্ত মূল্য সরাসরি কর্পোরেট মুনাফায় পরিণত হয়। অর্থাৎ যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করে জনগণ, আর যুদ্ধসৃষ্ট বাজার-অস্থিরতার সুবিধা ভোগ করে বৃহৎ কর্পোরেশন। এটিই সংকটনির্ভর মুনাফার রাজনীতি, যেখানে মানবিক বিপর্যয়ও ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত হয়। এ বাস্তবতা এতটাই স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন, তেল কোম্পানিগুলো ‘সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করছে।’ তিনি বলেন, এ মুনাফার একটি অংশ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। যদিও একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যের উত্তর সাগরের তেলসম্পদ আরও বেশি কাজে লাগানোর পক্ষে মত দেন। একইভাবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম উত্তর সাগরের সম্পদ পুরোপুরি উপেক্ষা করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে পরিবেশবাদীরা সতর্ক করেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নতুন করে নির্ভরতা জলবায়ু সংকটকে আরও গভীর করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানবসভ্যতার জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনবে। কিন্তু যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি মানবিকও। ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, অসংখ্য মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। একটি দেশের ওপর বোমা পড়লে তার অভিঘাত শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে তার প্রতিফলন দেখা যায়। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে যেমন মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির বোঝাও সাধারণ মানুষের কাঁধে এসে পড়ে। সবচেয়ে বড় আঘাত সহ্য করে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং উৎপাদন ব্যয় একযোগে বৃদ্ধি পায়। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, বিদ্যুতের দাম বাড়ে, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে শুরু করে। মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় শিকার হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের আয় স্থির থাকলেও ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে বহুজাতিক করপোরেশনগুলো তাদের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য রেকর্ড মুনাফা ঘোষণা করে। পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর বক্তব্যও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের মতে, যখন ইউরোপ দাবানল, খরা ও চরম আবহাওয়ার অভিঘাতে বিপর্যস্ত, তখন জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর এই অস্বাভাবিক মুনাফা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তারা অতিরিক্ত কর্পোরেট মুনাফার ওপর কার্যকর উইন্ডফল ট্যাক্স আরোপ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে সেই অর্থ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ বর্তমান সংকট শুধু জ্বালানির নয়; এটি ন্যায়বিচার, বৈষম্য এবং বৈশ্বিক সম্পদ বণ্টনের সংকটও। আজকের বিশ্বে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজার এবং কর্পোরেট মুনাফা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিল, যুদ্ধের লাভভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত কখনোই একই পক্ষ নয়। একদিকে মানুষ প্রাণ হারায়, বাস্তুচ্যুত হয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করে; অন্যদিকে বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলো রেকর্ড মুনাফা অর্জন করে। এ বৈপরীত্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক সংকটকেই সামনে আনে। যুদ্ধের অবসান, জ্বালানি বাজারে স্বচ্ছতা, করপোরেট জবাবদিহি এবং তৃতীয় বিশ্বের মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই বৈষম্যের চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
ফারুক যোশী
লেখক : বৃটেনপ্রবাসী কলামিস্ট
