দেশমাতৃকার সংকটে পথ দেখাবে জুলাই
শামসুর রহমান সুমন
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এ দেশের আপামর মানুষের জীবন্ত বৈপ্লবিক ইতিহাস, যা এখনও দেয়ালে দেয়ালে অঙ্কিত রয়েছে। চব্বিশের উত্তাল জুলাইয়ের এ আন্দোলন হয়ে উঠেছিল সর্বস্তরের মানুষের গণআন্দোলন। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কোটা সংস্কার আন্দোলন সংঘটিত হলেও এক পর্যায়ে রূপ নেয় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র, শিক্ষক, সাংস্কৃতিককর্মী, পেশাজীবী বিভিন্ন সংগঠন, কৃষক, রিকশাচালক, দিনমজুর সবার মধ্যে। সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে স্বৈরাচারকে হটিয়ে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে। অভিভাবকরা বেরিয়ে এসেছিলেন, তৃষ্ণার্ত আন্দোলনকারীদের পানি দিয়ে, খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জুলাই আন্দোলনে বড় একটি সাহস জুগিয়েছিল নারী শিক্ষার্থীরা। ১৪ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা হলের তালা ভেঙে মিছিলে অংশগ্রহণ করে।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ যেন নতুন মাত্রা আনে ঠাকুরগাঁওয়ের সে বিপ্লবী কিশোরীর স্লোগান, ‘কে এসেছে কে এসেছে, পুলিশ এসেছে পুলিশ এসেছে; কী করছে? কী করছে? স্বৈরাচারের পা চাটছে’ মানুষকে আন্দোলিত করে তোলে। আওয়ামী লীগ সরকারের দমননীতিকে উপেক্ষা করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ঢল নামে এ আন্দোলনে। ভয়াবহ করে তুলেছিল স্বৈরশাসক সে সময়ের পরিস্থিতিকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি, হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুড়ে আন্দোলন দমানোর ব্যর্থ প্রয়াস করে।
১৯৭১ সালে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাঙালি জাতি লড়াই করে এক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দেয়। বারংবার বিভিন্ন সরকার পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু মানুষের প্রকৃত মুক্তি মেলেনি। ১৭ বছর আওয়ামী লীগের বিরোধীমত দমন, গণতন্ত্র বিনষ্ট, গুম-খুন মানুষকে অতিষ্ঠ করে তোলে। তাই সাম্য, গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ আর সামাজিক সুবিচার ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রংপুরের তপ্ত রাজপথে বুক চিতিয়ে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যাওয়া এক অকুতোভয় তরুণ শহিদ আবু সাঈদ। রংপুরের জুলাই আন্দোলন এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে নির্মমভাবে হত্যার পর কীভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনে রূপ নিল।
খুব কাছে থেকে শহিদ আবু সাঈদকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। অসাধারণ নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন একজন মানুষ। সন্ত্রাসীদের হুংকার আর ক্ষমতাসীনদের দাপটে তিনি কখনও পিছপা হননি। আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়েছে। তারা ভেবেছিল, শহিদ আবু সাঈদকে দমাতে পারলে রংপুরের আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়া যাবে, কিন্তু স্বৈরশাসক ব্যর্থ হয়েছে।
আবু সাঈদকে হত্যার পর সে স্ফুলিঙ্গের মতে ফিরে আসে। চট্টগ্রামের ওয়াসিম, ঢাকায় মুগ্ধরা তাদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। চারদিকে এত এত রক্ত আর লাশ জাগিয়ে তোলে বাংলার মানুষকে। কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেপ্তার, দমনপীড়ন- কোনো কিছুই যেন দমিয়ে রাখতে পারেনি। মাত্র ৩৬ দিনের এ আন্দোলন সর্বস্তরের জনমানুষের সমাগম ঘটিয়ে একটি গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেছে, যা ইতিহাসে বিরল।
এ জনগোষ্ঠীর চাওয়া ছিল খুবই ক্ষুদ্র। তারা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিল, যেখানে অধিকারের কথা ধ্বনিত হলে রাষ্ট্র তাদের ওপর লাঠিয়াল বাহিনীকে লেলিয়ে দেবে না! স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের মানুষ বারবার আশাহত হয়েছে। জুলাই আন্দোলন ফের মানুষকে সেই আশা জাগিয়েছিল। তারা স্বপ্ন বুনেছিল সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের মনে যে আশার সঞ্চার করেছে সেটার যথাযথ প্রতিফলন না হলে আবারও দেশ পিছিয়ে যাবে, মানুষের নিরাপত্তা, আইনের শাসন বিঘ্নিত হবে, অপশক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু এ প্রজন্ম নয় বরং আগামী প্রজন্ম এটিকে ধারণ করবে। দেশমাতৃকার যে কোনো সংকটকালীন মুহূর্তে আবারও প্রজন্ম মাথা উঁচু করে দু’হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে।
শামসুর রহমান সুমন
লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
