পর্যটনের অর্থনীতি

জাবেদ আহমেদ

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘পর্যটনের অর্থনীতি’ ধারণাটি শুনতে নতুন মনে হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এটি এমন নতুন কিছু নয়। আমাদের আশপাশের দেশগুলোর মতো আমরাও পর্যটন খাত থেকে কিছু আয় করে থাকি। একটি বড় সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও আমাদের দুর্বল পর্যটন খাত করে থাকে। উপযুক্ত পরিসংখ্যান না থাকলেও এ সংখ্যা ৭৫ লাখের নিচে নয় বলে আমার বিশ্বাস। আর এ কথা আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ।

কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিয়মিত আয়ের সংস্থান এবং বিনিয়োগ থাকায় দেশের পর্যটনকে ঘিরে একটি অর্থনীতি আমাদের দেশে বিদ্যমান। এ অর্থনীতিই হচ্ছে পর্যটন অর্থনীতি। আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে পর্যটন অর্থনীতি নিয়ে কোনো হইচই খুব একটা শোনা যায় না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল থেকেও এ বিষয়ে কিছু বলা হয় না। অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান না থাকায় সম্ভবত এ দশা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এখন ক্ষমতায়। ক্ষমতায় আসার পরে এ সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি লন্ডভন্ড অর্থনীতি পেয়েছে। লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের দৃশ্যমান অভাবের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি আরও নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া, ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ, সর্বোপরি হরমুজ সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি এখন টালমাটাল। এ ছাড়া আগামী নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হতে চলেছে। এ রূপান্তরে কিছু নগদ অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও হারাতে হবে অনেক কিছু।

বাজেটে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ না করে স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে বাজেটে অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন।

এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য বছর তিন-চারেক আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করে। কৌশলপত্র প্রণয়নের সেই কর্মযজ্ঞে যুক্ত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে- এমন অনেক দেশীয় উদ্যোগের কথা উক্ত কৌশলপত্রে উল্লেখ রয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে পর্যটন খাতও অন্তর্ভুক্ত। বিএফটিআইয়ের উক্ত কৌশলপত্রের ভিত্তিতে অর্থনীতি এগোচ্ছে মর্মে দৃশ্যমান কিছু দেখছি না। কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে প্রণীত উক্ত কৌশলপত্র কর্মকর্তাদের ড্রয়ারে বা অফিসের শেলফে অবস্থান নিয়েছে বলে ধারণা করা যায়। দেশি-বিদেশি ঋণনির্ভরতা কমাতে হলে সম্ভাবনাময় দেশীয় উদ্যোগগুলোকে প্রাধান্য দিতেই হবে। এ মুহূর্তে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দেশীয় উদ্যোগের মধ্যে সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প যে অনেক শক্তিশালী, এ কথা আমি বলছি না; বরং এটি একটি দুর্বল খাত হিসেবেই পরিচিত। আদতে খাতটি দুর্বল নয়, বরং এটিকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে। এ দেশে পর্যটন সম্পদের কোনও অভাব নেই। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বন- সব কিছুই প্রকৃতি উজাড় করে দিয়েছে আমাদের। দীর্ঘ বছর ধরে সরকারগুলোর ধারাবাহিক উদাসীনতার কারণে এ সম্পদগুলোকে আমরা পর্যটন পণ্যে রূপান্তর করতে পারিনি। পর্যটন পণ্য যতটুকু আছে, তাকে ঘিরেই আমাদের ‘পর্যটন অর্থনীতি।’

পর্যটন-প্রধান অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ডমেস্টিক, ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড- সব ধরনের পর্যটনই হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ডমেস্টিক পর্যটনের আধিক্য বেশি। আউটবাউন্ড ট্যুরিজম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী, তবে ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের নিম্নমুখী প্রবণতা দৃশ্যমান। এ বিষয়ে পৃথক একটি গবেষণা হতে পারে। এখানে সে বিষয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছি না।

সুষ্ঠুভাবে পর্যটন ব্যবস্থাপনার জন্য ট্যুর অপারেটর এবং ট্যুর গাইডদের ভূমিকা অনন্য। আমাদের দেশে একটি বড় সংখ্যক শিক্ষিত, মার্জিত এবং রুচিশীল ভদ্রলোক সানন্দে এ পেশা বেছে নিয়েছেন। সরকারের তরফ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা না পেলেও তারা তাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে পর্যটন ব্যবসা এগিয়ে নিচ্ছেন। কালপরিক্রমায় রাষ্ট্রযন্ত্রের ন্যূনতম সহযোগিতা ছাড়াই দেশীয় পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে আরও কতিপয় বেসরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। যেমন- টাঙ্গুয়ার হাওরকেন্দ্রিক হাউজবোট, সুন্দরবনগামী বিলাসবহুল লঞ্চ বা সেন্টমার্টিনগামী প্রমোদতরি। এসব উদ্যোগে বিনিয়োগের পরিমাণও অনেক বেশি। সম্ভবত দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এদের ঋণ প্রদান করা হয়।

আমাদের দেশের পর্যটন খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি। এ অনুষঙ্গটির প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। পর্যটন নগরী কক্সবাজার বা কুয়াকাটায় গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের তারকা মানের হোটেল। তাছাড়া দেশের আনাচে-কানাচে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি পরিবেশে অনেকটা পরিবেশবান্ধব কায়দায় গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটনকেন্দ্র, যেগুলো রিসোর্ট নামে অধিক পরিচিত।

আমার জানা মতে, দেশের পর্যটন শহরগুলোতে গড়ে ওঠা হোটেলগুলো কিংবা গ্রামাঞ্চলের নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে ওঠা রিসোর্টগুলো মোটামুটিভাবে ব্যবসা সফল। পর্যটন বিষয়ে পড়াশোনা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের জন্য এটি চমৎকার কর্মক্ষেত্র।

পর্যটন শিল্পের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে ডমেস্টিক এয়ারলাইনস। এ উদ্যোগে বিনিয়োগের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। গত এক দশকে দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি বিনিয়োগ দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সবাই ব্যবসাসফল হতে পারেনি। তবে যারা বর্তমানে টিকে আছে, তারা যে ভীষণ ব্যবসাসফল, তা সহজেই অনুমেয়। পর্যাপ্ত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এ খাতের বেসরকারি উদ্যোগগুলো কেন হারিয়ে গেল, সে বিষয়ে পৃথক গবেষণা হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যটনশিল্প থেকে পূর্ণমাত্রায় সুবিধা আদায় করতে হলে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সরকারি খাত কী ধরনের সহযোগিতা করবে কিংবা বেসরকারি খাতই বা কীভাবে ভূমিকা পালন করবে- এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা এনবিআর বাজেটপূর্ব সময়ে পর্যটন স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে এক বা একাধিক সভা করে উন্নয়নের কৌশল নির্ধারণ করে নিতে পারে।

এখনকার সময়ের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, আমাদের হাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। এ মাস্টারপ্ল্যানটি ধরে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজাতে পারলে এ শিল্পকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেওয়া যাবে বলে মনে করা যায়। তবে যে কথাই বলি না কেন, দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের জন্য মার্কেট রিসার্চ ও মার্কেট ডেভেলপমেন্ট বিষয়গুলোর ওপর নিরন্তর গবেষণা এখন সময়ের দাবি। পর্যটনের মৌলিক সুবিধা সংবলিত অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারকে একটি বড় পুঁজি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সরকারের যদি সামর্থ্য না থাকে, সেক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে।

দেশে ট্যুরিস্ট পুলিশের সংখ্যা বাড়িয়ে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। আমাদের দেশে অবস্থিত মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও ভারতের দূতাবাস যেমন করে রোড শোর মাধ্যমে তাদের দেশের পর্যটনের বাজার সৃষ্টি করছে, একইভাবে ওই সব দেশে অবস্থিত আমাদের বৈদেশিক মিশনগুলোর মাধ্যমে রোড শো করে দেশের পর্যটনশিল্পকে সেসব দেশের ভোক্তাদের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে।

অপরদিকে, পর্যটনশিল্পের প্রাণভোমরা বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করতে হলে সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত নীতিসহায়তা দিতে হবে। করের চাপে জর্জরিত পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর আরোপিত অযৌক্তিক করভার কমিয়ে আনতে হবে। বিদেশি পর্যটক টানতে সাবরাংয়ের মতো উদ্যোগগুলোকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে হবে।

একজন পর্যটনকর্মী এবং অর্থনীতির একজন নগণ্য ছাত্র হিসেবে আমার বিশ্বাস, যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে পারলে আগামীদিনে অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প।

জাবেদ আহমেদ

লেখক : সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড