অনলাইন জুয়া : নীরব মহামারি ও তার প্রতিকার
আহমেদ সোহেল বাপ্পী
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিটি সমাজে কিছু সংকট এমনভাবে আসে, যেন তার কোনো শব্দ নেই, কোনো মিছিল নেই, কোনো স্লোগান নেই; অথচ ঘরে ঘরে তার বিষ ছড়িয়ে পড়ে নিঃশব্দে। বাংলাদেশের অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠিক এমনই এক নীরব মহামারি। মোবাইল স্ক্রিনের আলোয়, রাতের নির্জনতায়, একা ঘরের কোণে বসে যে যুবক কিংবা গৃহকর্তা মুঠোফোনের অ্যাপে বাজি ধরছেন, তার নিঃসঙ্গতা রাষ্ট্রের কাছে বহুদিন অদৃশ্য ছিল। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি প্রযুক্তির অগ্রগতিকে এতটাই উদযাপন করেছি যে, তার অন্ধকার দিকটি দেখার সময় ও সদিচ্ছা কোনোটিই রাখিনি?
২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈধ মোবাইল গেমিং বাজার প্রায় ১৯ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ১২ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। আর সক্রিয় মোবাইল ব্যবহারকারী পৌঁছেছে প্রায় সাড়ে সাত কোটিতে। এ বিপুল ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অভ্যস্ততাই পরবর্তী সময় অসাধু আন্তর্জাতিক জুয়া সিন্ডিকেটের জন্য এক প্রস্তুত ক্ষেত্র তৈরি করেছে। করোনাকালের দীর্ঘ অবরুদ্ধ সময়ে ঘরবন্দি তরুণ প্রজন্ম যখন বিকল্প বিনোদনের সন্ধানে ছিল, তখনই বাজি, বেটউইনার, ওয়ানএক্সবেট, মোস্টবেটের মতো অফশোর প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলা ভাষায় স্থানীয়করণ করে বাংলাদেশি বাজারে প্রবেশ করে। পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়, তা প্রতিটি পরিবারের কান্নার প্রতিধ্বনি।
সরকারি পরিকল্পনা কমিশনের অধীন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ নিয়মিত অনলাইন জুয়ায় আসক্ত, এবং কার্যকর হস্তক্ষেপ না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত আইগেমিং খাতের আকার আনুমানিক ৬২ থেকে ৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও, এর সমান্তরালে সম্পূর্ণ অবৈধ চ্যানেলে বার্ষিক প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে বলে একাধিক স্বাধীন অনুসন্ধান নিশ্চিত করেছে।
এ সংকটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো, এখানে ভুক্তভোগী কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ নয়; বরং সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরের মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী, বেকার তরুণ, পোশাক কারখানার নারী শ্রমিক, চা বাগানের মৌসুমি শ্রমিক, দিনমজুর, ভ্যানচালক, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক; প্রত্যেকেই এ ফাঁদে পড়ছেন একই সহজ প্রলোভনে: সামান্য বিনিয়োগে দ্রুত বড় অংকের অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন। যে মানুষটি সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করেও দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা পান না, তার কাছে মুঠোফোনের একটি বোতাম টিপে রাতারাতি হাজার টাকা জেতার প্রলোভন প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ আসক্তির পেছনে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপনগুলো সাধারণ মোবাইল গেম বা সংবাদ পোর্টালের ছদ্মবেশে হাজির হয়, যাতে বিজ্ঞাপন-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তা শনাক্ত করতে না পারে। এরপর টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের বন্ধ গ্রুপে স্থানীয় ‘এজেন্ট’রা প্রায়শই এলাকারই পরিচিত দোকানদার বা তরুণ সরাসরি সহায়তা দিয়ে ব্যবহারকারীর আস্থা অর্জন করেন, যা জুয়াকে সামাজিক লজ্জামুক্ত ও স্বাভাবিক বিষয় বলে মনে করায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রেফারেল কমিশনের প্রলোভন। একজন ব্যবহারকারী তার বন্ধু বা সহকর্মীকে যুক্ত করলে কমিশন পান, ফলে প্রতিটি আসক্ত ব্যক্তি নিজের অজান্তেই একজন নিয়োগকারীতে পরিণত হন। এভাবে জুয়া একজন ব্যক্তির সমস্যা থেকে পুরো পাড়া বা কর্মক্ষেত্রের সামষ্টিক সংকটে রূপ নেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, লাইভ ক্রিকেট ম্যাচ বা বিশ্বকাপের মতো উপলক্ষ্যে বাজি ধরার প্রবণতা মৌসুমি জোয়ারের মতো বেড়ে যায়, আর তখনই কিছু মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজ ডিপোজিটের সুযোগ দরিদ্র মানুষকে সঞ্চয়হীন এক তাৎক্ষণিক জুয়াড়িতে পরিণত করে।
যে পরিবার এরই মধ্যে দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বসবাস করে, জুয়ার আসক্তি তার জন্য চূড়ান্ত বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রথমে সঞ্চয় শেষ হয়, তারপর ঘরের স্বর্ণালংকার বিক্রি হয়, এরপর উচ্চ সুদে এনজিও বা মহাজনি ঋণ নেওয়া শুরু হয়। ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন পরিবারে অবিশ্বাস ও সন্দেহের বীজ বপন হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অর্থ নিয়ে বিবাদ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়। এমন বহু ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে যেখানে জুয়ায় আসক্ত স্বামী সংসারের খাদ্য বা সন্তানের শিক্ষার জন্য রাখা অর্থও তুলে নিয়েছেন, ফলে স্ত্রী ও সন্তানদের অপুষ্টি ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে হয়েছে।
দাম্পত্য সম্পর্কে এ ক্ষয় প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে রূপ নেয়। ঋণখেলাপির লজ্জা ও সামাজিক অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেক পুরুষ ঘরে ফিরে স্ত্রীর ওপর তার হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যা পারিবারিক সহিংসতার একটি উপেক্ষিত কিন্তু ক্রমবর্ধমান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে ঋণের দায় মেটাতে গিয়ে জমি বা ব্যবসার পুঁজি বিক্রি করে পরিবারকে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হতে হয়, যা কয়েক দশকের অর্জিত সামাজিক অবস্থানকে এক নিমেষে ভেঙে দেয়। সন্তানদের ওপর এর প্রভাবও কম নয়। পারিবারিক অস্থিরতা ও আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা প্রায়ই লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, কেউ কেউ পরিবারের আয়ে অবদান রাখতে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ে। ঋণ পরিশোধের মরিয়া চেষ্টায় কেউ কেউ চুরি-ছিনতাই বা প্রতারণার মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছেন, যা কেবল ব্যক্তি ও পরিবারের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো সমাজের নিরাপত্তা ও সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ প্রবণতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় দারিদ্র্য-ঋণের ফাঁদ ও সামাজিক লজ্জা যখন একসঙ্গে মিলিত হয়, তখন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। আর অনলাইন জুয়ার সহজলভ্যতা এ দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়ে মানুষকে আরও গভীর সংকটে টেনে নেয়।
বাংলাদেশের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) খাত ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ১৩টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২৩ কোটির বেশি নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট নিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ৫,৩০০ কোটি টাকার লেনদেন পরিচালনা করেছে। ২০২৫ সালে এই দৈনিক গড় লেনদেন প্রায় ৫৯০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা যায়। এ বিশাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অবকাঠামো যেমন লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করেছে, তেমনি তা জুয়া সিন্ডিকেটের কাছে একটি সুবিধাজনক মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে। ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে খোলা ‘ঘোস্ট সিম’ ও ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তা পরবর্তীতে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। এ কাঠামো এতটাই সুসংগঠিত যে প্রচলিত লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার পক্ষে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক অর্থবছরে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার একটি বড় অংশ অনলাইন গেমিং, স্পোর্টস বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি সংশ্লিষ্ট লেনদেনের সাথে যুক্ত। প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একদিন আমাদের গর্বের বিষয় ছিল, আজ তা কীভাবে আমাদের যুবসমাজ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই অস্ত্র হয়ে উঠল?
গত ৩০ জুন সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়া জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। ঔপনিবেশিক আমলের ১৫৯ বছরের পুরোনো পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট ১৮৬৭-কে রহিত করে প্রণীত এ আইনে ২৪টি ভিন্ন ধরনের জুয়া-সংশ্লিষ্ট অপরাধ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং অনলাইন বা রিমোট জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা, আর সরাসরি অনলাইন বেটিংয়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ভিপিএন ও প্রক্সি সার্ভার ব্যবহারের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং ভুয়া সিম বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহারও এখন সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একইসাথে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২০ ধারা বিলুপ্ত করে জুয়া-সংক্রান্ত বিচারকে একটি সুনির্দিষ্ট, বিশেষায়িত কাঠামোর অধীনে আনা হয়েছে, যা এখতিয়ারগত জটিলতা কমাবে বলে আশা করা যায়। তবে এ আইনের প্রয়োগ ক্ষমতা নিয়ে সংসদেই বিরোধী সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পূর্বানুমতি ছাড়াই তল্লাশি, ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল সম্পদ জব্দ করার ক্ষমতা, কিংবা আদালতের আদেশ ছাড়া ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার; এসব বিধান নিরাপত্তা ও নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে একটি স্পর্শকাতর ভারসাম্যের প্রশ্ন তুলে ধরে।
সরকারের যুক্তি, জুয়া সিন্ডিকেট এতটাই দ্রুতগতিতে কাজ করে যে বিলম্বিত বিচারিক প্রক্রিয়া তাদের সার্ভার ও ক্রিপ্টো ওয়ালেট মুছে ফেলার সুযোগ করে দেবে। এ যুক্তির বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না, তবে ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, জরুরি প্রয়োজনে দেওয়া অসাধারণ ক্ষমতা প্রায়শই সাধারণ ব্যবহারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে। তাই এ আইনের বাস্তবায়নে বিচার বিভাগীয় তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
একটি প্রশ্ন এখানে অবধারিতভাবে চলে আসে, আইন কি একাই এ সংকট সমাধান করতে পারবে? উত্তর, নিঃসন্দেহে ‘না’। ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ যেখানে বহু-সংস্থা সমন্বিত টাস্কফোর্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক বিজ্ঞাপন-শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, সেখান থেকে বাংলাদেশের শেখার অনেক কিছু আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউকে এমএফএস ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওপর প্রকৃত রিয়েল-টাইম নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে; বিটিআরসিকে অবৈধ জুয়ার সাইট ও মিরর ডোমেইন দ্রুত শনাক্ত ও ব্লক করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
কিন্তু এসবের চেয়েও জরুরি হলো আসক্ত ও ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন। যে দরিদ্র পরিবার ঋণের ফাঁদে জর্জরিত, তার প্রয়োজন কারাগার নয়, বরং সহজ শর্তে ঋণ পুনর্গঠন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও পারিবারিক পরামর্শ সেবা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক-অধ্যুষিত এলাকায় ডিজিটাল সাক্ষরতা ও আর্থিক সচেতনতার কর্মসূচি চালু করা এখন সময়ের দাবি, যাতে পোশাক কারখানার শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষক পর্যন্ত প্রত্যেকে জুয়ার প্রকৃত ঝুঁকি বুঝতে পারেন। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ছদ্মবেশী জুয়ার বিজ্ঞাপন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে পরিচালিত প্রচারণা বন্ধ করতে সরকার ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সরাসরি ও কার্যকর যোগাযোগ চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। রাষ্ট্র যদি কেবল দণ্ডবিধির ভাষায় কথা বলে, আর সমাজ যদি আসক্তিকে লজ্জার বিষয় বানিয়ে রাখে, তবে ভুক্তভোগীরা সাহায্য চাইতে ভয় পাবে; আর নীরবতার মধ্যেই সংকট আরও গভীর হবে।
বাংলাদেশ আজ এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে ডিজিটাল অর্থনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গর্বিত অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে সেই একই প্রযুক্তির অপব্যবহারে তৈরি হওয়া এক ধ্বংসাত্মক ছায়া অর্থনীতি যা সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে তাদের, যাদের সহ্য করার ক্ষমতা সবচেয়ে কম। জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬ এই লড়াইয়ের একটি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার, কিন্তু তা চূড়ান্ত সমাধান নয়। আইনের কঠোরতা যদি সমাজের সহানুভূতি ও রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছার সাথে মিলিত না হয়, তবে আজকের বিজয় আগামীকালের ব্যর্থতায় পরিণত হতে পারে।
শেষ প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়; আমরা কি কেবল অপরাধীকে শাস্তি দিতে চাই, নাকি আমাদের সবচেয়ে দুর্বল পরিবারগুলোকে সত্যিকার অর্থে রক্ষা করতে চাই? এ দুটি লক্ষ্যের মধ্যে যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য, তার উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
আহমেদ সোহেল বাপ্পী
লেখক : মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক
