অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের দৌরাত্ম্য ও প্রান্তিক জেলেদের হাহাকার

সাইয়্যিদ মঞ্জু

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ বঙ্গোপসাগর শুধু নীল জলরাশির ভাণ্ডার নয়, এটি দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রোটিনের প্রধান উৎস। উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ প্রান্তিক জেলের জীবন ও জীবিকা এ সাগরের সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে শুরু হয়েছে এক নির্মম বিনাশী খেলা। অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং বোট, ক্ষতিকর ট্রলিং জাল এবং অগভীর পানিতে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ট্রলিংয়ের কারণে সমুদ্রের প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেমন মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হচ্ছে, তেমনি দিন শেষে সমুদ্র থেকে শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে সাধারণ জেলেদের।

সাধারণত সমুদ্রের তলদেশ ঘেঁষে বিশালাকার জাল টেনে মাছ ধরাকে ট্রলিং ফিশিং বলা হয়। শিল্পভিত্তিক ট্রলিংয়ের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম এবং সমুদ্রের গভীর এলাকায় মাছ ধরার অনুমোদন থাকলেও ইদানীং অতি মুনাফালোভী একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কাঠের তৈরি ট্রলারকে অবৈধভাবে ‘আর্টিসানাল ট্রলার’-এ রূপান্তর করে ট্রলিং পরিচালনা করছে।

এ আর্টিসানাল ট্রলারে ব্যবহৃত জাল, সাগরের তলদেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এর থেকে নিস্তার পায় না। ছোট-বড় মাছ, পোনা, প্রজননক্ষম মা-মাছ, এমনকি প্রবাল ও সামুদ্রিক উদ্ভিদ- সবকিছুকে এ ভারী জাল ছেঁকে তুলে নিয়ে আসে। যা তোলা হয়, তার একটি বড় অংশ বাণিজ্যিক মূল্যের অভাবে সাগরেই মৃত অবস্থায় ফেলে দেওয়া হয়।

মাছ ধরার আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইন অনুযায়ী, শিল্পভিত্তিক ও ট্রলিং বোটগুলোর জন্য সাগরের ৪০ মিটার গভীরতার বাইরের অংশ নির্ধারিত। সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও পোনা বড় হওয়ার প্রক্রিয়াটি মূলত উপকূলীয় অঞ্চলের অগভীর পানিতে (৪০ মিটারের কম গভীরতায়) সম্পন্ন হয়।

কিন্তু অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ বাঁচানো এবং সহজে বেশি মাছ পাওয়ার লোভে অসাধু বোট মালিক ও ট্রলার চালকরা রাতের আঁধারে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে উপকূলের অতি কাছাকাছি, অর্থাৎ অগভীর পানিতে চলে আসে। এ অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে যেসব অগভীর জলসীমায় সাধারণ জেলেরা ডিঙ্গি নৌকা ও ছোট ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে কাঠফাটা রোদ আর ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জাল ফেলেন, সেখানে বড় বড় ট্রলারের ভারী ট্রলিং জাল মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু নিঃশেষ করে দেয়।

অগভীর পানিতে ট্রলিংয়ের এ নির্মম আগ্রাসনের সরাসরি শিকার হচ্ছেন দেশের সাধারণ ও ঐতিহ্যবাহী জেলেরা। তারা সাগরে নামেন ছোট জাল এবং কাইন বড়শি নিয়ে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু বিশাল ট্রলারের তলদেশীয় ট্রলিং জালের মহড়াতে ছোট জেলেদের ফেলে রাখা সাধারণ জালগুলো ছিঁড়ে নষ্ট হয়ে যায়। কয়েক দিন টানা সাগরে অবস্থান করে, চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বা সঞ্চয় ভাঙার পুঁজি খাটিয়ে সাগরে গিয়ে যখন জেলেরা খালি হাতে তীরে ফেরেন, তখন তাদের পরিবারে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। ট্রলিংয়ের প্রভাবে সাগরে মাছের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সাধারণ নৌকার জেলেরা এখন আর তাদের কাঙ্ক্ষিত ইলিশ বা অন্যান্য মাছ পাচ্ছেন না।

ফলে, সাধারণ জেলেরা জাল, তেল ও রসদের খরচ তুলতে না পেরে ক্রমাগত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। উপকূলীয় অঞ্চলের শত শত পরিবার বংশানুক্রমিক এ পেশা ছেড়ে দিয়ে শহরে দিনমজুর, রিকশাচালক বা কাজের সন্ধানে অভিবাসী হতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাংলাদেশ যখন সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির বিপ্লব ঘটানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের উপর এ রূপ নির্মম আক্রমণ সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। সমুদ্রের তলদেশ হলো সামুদ্রিক প্রাণীর বাসস্থান ও প্রজননক্ষেত্র। ট্রলিং জাল যখন সমুদ্রের তল ঘেষে যায়, তখন তা সেখানকার প্রবাল প্রাচীর, সামুদ্রিক ঘাস এবং ডিম ছাড়ার স্থানগুলোকে লাঙলের ফালের মতো চষে ধ্বংস করে দিয়ে যায়। সমুদ্রের প্রজনন চক্র এভাবে ভেঙে পড়লে অদূর ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর মাছ শূন্য হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে এ সংকটের ব্যাপ্তি শুধু পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত সামাজিক ন্যায়বিচার ও উপকূলীয় সংস্কৃতির বিলুপ্তির সঙ্গে। শতাব্দী ধরে যে প্রান্তিক জেলেরা বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে এক আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন, আজ তারা নিজ ভূখণ্ডেই পরবাসী। আধুনিক প্রযুক্তির দাপট আর অসাধু অর্থালিপ্সার সামনে ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার পদ্ধতিগুলো মার খাচ্ছে। সাগরের জলজ বাস্তুতন্ত্রের এই বিপর্যয় দূরবর্তী শহরের বাজারগুলোতেও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে- মাছের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রোটিনের অপূরণীয় ঘাটতি এরই প্রাথমিক লক্ষণ। আন্তর্জাতিক বাজারে সামুদ্রিক মৎস্য রপ্তানির যে বিশাল সম্ভাবনা বাংলাদেশের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল, মানহীন ও অপরিপক্ক মাছ শিকারের কারণে তাও এখন মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে। মূলত এ অনিয়ন্ত্রিত ট্রলিং ব্যবস্থা যদি রূপান্তরের মুখ না দেখে, তবে আমাদের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান দ্রুত সংকুচিত হতে বাধ্য।

সাগরে অবৈধ ট্রলিং বন্ধে ‘সামুদ্রিক মৎস্য আইন, ২০২০’ এবং বিভিন্ন কঠোর নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে-

বিশাল সমুদ্রসীমায় কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর টহল নৌযানের সংখ্যা এবং সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের মনিটরিং সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সব আর্টিসানাল ট্রলারে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং বা ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেম বাধ্যতামূলক না করায় তাদের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। অসাধু বোট মালিকদের বড় অংশ প্রভাবশালী হওয়ায় তারা স্থানীয় আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যায়।

সমুদ্রের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রান্তিক জেলের রুটি-রুজি বাঁচিয়ে রাখতে অনতিবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি :

অগভীর পানিতে অবৈধ ট্রলার প্রবেশ রোধে কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও মৎস্য দপ্তরের যৌথ ও নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। আইন অমান্যকারী বোটের নিবন্ধন বাতিল এবং কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রতিটি আর্টিসানাল ও বাণিজ্যিক ট্রলারে ‘ভেসেল ট্র্যাকিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বা জিপিএস বসানো বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে কোনো ট্রলার ৪০ মিটার গভীরতার সীমারেখা অতিক্রম করে অগভীর পানিতে এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পাওয়া যায়।

ক্ষতিকর ও কম ব্যাসের ট্রলিং জাল তৈরি, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হবে এবং বাজেয়াপ্ত জাল প্রকাশ্যে ধ্বংস করতে হবে।

সাগরে অবৈধ ট্রলিং প্রতিরোধে সাধারণ জেলেদের নিয়ে ‘কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ’ গঠন করা যেতে পারে, যারা সাগরে অবৈধ ট্রলার দেখলেই তাৎক্ষণিকভাবে নৌ পুলিশ বা কোস্টগার্ডকে তথ্য প্রদান করবে।

সমুদ্র কোনো একক গোষ্ঠীর মুনাফা লোটার ক্ষেত্র নয়,এটি জাতীয় সম্পদ এবং লাখ লাখ মানুষের বাঁচার অবলম্বন। অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং ও অগভীর পানিতে লোভাতুর মাছ শিকার শুধু সাধারণ জেলেদেরই নিঃস্ব করছে না, বরং আমাদের সামুদ্রিক ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিকে বাঁচানো এবং নিঃস্ব সাধারণ জেলেদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য অবৈধ ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে এখনই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে, অচিরেই আমাদের সাগরের বুক খালি হয়ে যাবে, আর তীরের সাধারণ মানুষগুলোকে চিরতরে শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

সাইয়্যিদ মঞ্জু

লেখক : কবি ও লেখক