মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমাতে হবে

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিত্যপণ্যের বাজারের উত্তাপ এখন শুধু মাছ, মাংস কিংবা চাল-ডালে সীমাবদ্ধ নেই। এ উত্তাপ লেগেছে শাকপাতায়ও। কেননা, গত দুই মাসে শাকের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বলা বাহুল্য, এমন দাম বৃদ্ধির পেছনে সাধারণত দায়ী থাকার কথা সরবরাহ ঘাটতির। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের বাজারব্যবস্থায় অন্যান্য সবজি কিংবা পণ্যের দাম বৃদ্ধির মতোই এ ক্ষেত্রেও বাজারে কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্টি করা হয়েছে নৈরাজ্য। আর এ ক্ষেত্রেও বরাবরের মতোই নেই সুষ্ঠু তদারকির কোনো ব্যবস্থাপনা।

রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে শাকসবজি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামে যে লাফ দেখা যাচ্ছে, তা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলারই প্রতিচ্ছবি। অত্যন্ত করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ। শ্রমজীবী মানুষের একটি পরিবারের জন্য সামান্য শাক কিনতেই যদি পকেট ফাঁকা হয়ে যায়, তাহলে জীবন বাঁচানোর স্বাভাবিক পুষ্টির জোগান কীভাবে হবে?

সবচেয়ে হতাশার কথা হচ্ছে, কঠোর পরিশ্রম ও নানা প্রতিকূল পরিবেশে কৃষক যে পণ্যগুলো উৎপাদন করছেন, বাজারে দাম বৃদ্ধির ফল কিন্তু তারাও ভোগ করতে পারছেন না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বৃষ্টির কারণে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটা অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু মাঠ থেকে হাটে পৌঁছাতে যে দামের ফারাক তৈরি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাঠ থেকে কৃষকের কাছ থেকে যে শাকের আঁটি ৮-১০ টাকায় কেনা হচ্ছে, সেটাই বাজারে এসে কয়েকগুণ দাম বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণ কী? আমরা সবাই জানি, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও একাধিক হাত বদল। কারণটা পুরোনো। কিন্তু তার সমাধান আজও সম্ভব হয়নি। কেন সম্ভব হয়নি, সেটাও অজানা নয়। কেননা, বাজারব্যবস্থার এসব ত্রুটি ও সমাধান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-পরামর্শের কথা বিশ্লেষকরা হরহামেশাই বলে থাকেন। গণমাধ্যমের কল্যাণে মানুষ তা জানতে-বুঝতে পারেন। কিন্তু কী এক অজানা কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি সংস্থা, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যেন আজও বুঝে উঠতে পারেননি! অথবা দীর্ঘকাল ধরে সবাই উদাসীনতা দেখিয়ে আসছেন। যদি তা-ই না হবে, তাহলে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল সংক্ষিপ্তকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, তা কি সংশ্লিষ্টরা জানেন না? পচনশীল কাঁচাপণ্যের জন্য আঞ্চলিক পর্যায়ে বিশেষায়িত আধুনিক হিমাগার তৈরি এবং পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হতে হবে, তা তারা বোঝেন না? বাজারে কঠোর তদারকি প্রয়োজন, এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন কি দায় এড়াতে পারে?

আমরা মনে করি, আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য ও অতিরিক্ত হাতবদলের প্রক্রিয়াই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বাজারে বিদ্যমান এ ব্যবস্থার জন্য উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষকরা হচ্ছেন নির্মমতার শিকার। অর্থাৎ একদিকে কৃষক তার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন; অন্যদিকে পকেটকাটা হচ্ছে ভোক্তাদের। সুতরাং এ ব্যবস্থার অবসান এবং একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। তা না করা গেলে ফড়িয়াদের এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে এভাবেই অকার্যকর করে রাখবে। এ পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যেতে পারে না। কেননা এটি বাজার ব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে।

আমাদের প্রত্যাশা, বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও বিরাজমান ত্রুটি নিরসনে সরকার কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।