সীতাকুণ্ডে আর্তনাদ
পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আবারও মৃত্যুর মিছিল সীতাকুণ্ডে। আবারও কর্মস্থলে প্রাণ হারালেন শ্রমিক। এবার পুরোনো এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ গেল অন্তত ৯ শ্রমিকের। আরও কয়েকজন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। গত শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিলশিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দিনটি ৯টি পরিবারের জন্য চিরদিনের জন্য শোকের দিন হয়ে গেল।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো- এ দুর্ঘটনা যেন হঠাৎ করে আসেনি। গত মাসেই নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগ ছিল। তার পরও ইয়ার্ডে কাজ চলেছে। এর মাত্র ১ মাসের মধ্যে বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যু হলো। এ বাস্তবতা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগের পরও যদি কাজ বন্ধ না হয়, তাহলে শ্রমিকদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব কে নেবে?
শিপইয়ার্ডে পুরোনো জাহাজ কাটার কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে জাহাজের বদ্ধ কক্ষে বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকতে পারে। কাটার আগে জাহাজকে যথাযথভাবে গ্যাস ও রাসায়নিকমুক্ত করা জরুরি। শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ দিতে হয়। প্রস্তুত রাখতে হয় জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা। এসব নিয়ম শুধু কাগজে থাকার জন্য নয়। এসব নিয়ম শ্রমিকের জীবন বাঁচানোর জন্য।
এ দুর্ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ছবি এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। দুই ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা সেকান্দার হোসাইন। পাশাপাশি পড়ে আছে তার দুই সন্তান মুনসুর ও নাসিরের নিথর দেহ। একদিন আগেও তারা বাবার সঙ্গে ছিলেন। একসঙ্গে ভাত খেয়েছিলেন। আজ তারা পাশাপাশি শুয়ে আছেন মর্গে। একজন বাবা এর চেয়ে বড় শোক আর কীভাবে সহ্য করবেন?
মুনসুর ও নাসির দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ওই শিপইয়ার্ডে কাজ করেছেন। তারা পরিবারের উপার্জনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিলেন। তাদের মৃত্যুতে শুধু দুটি জীবন নিভে যায়নি। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বাবার চোখের পানি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ কি এতটাই কঠিন?
আরেকটি পরিবারের শোক আরও নির্মম। আট মাস আগে বিয়ে হয়েছিল পলাশ দাশের। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ভূমিকা রানী দাসকে রেখে কাজে গিয়েছিলেন তিনি। সন্তানের মুখ দেখা হলো না পলাশের। পৃথিবীতে আসার আগেই বাবাকে হারাল তার অনাগত সন্তান। মুছে গেল ভূমিকার সিঁদুর। একটি ছোট সংসারের সব স্বপ্ন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। পলাশের অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ কে বহন করবেন? অন্তঃসত্ত্বা ভূমিকার পাশে কে দাঁড়াবে? অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ কে নিশ্চিত করবে?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ দ্রুত বের করতে হবে। নিরাপত্তা ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে নিরাপত্তা নিয়ে মামলা হওয়ার পরও কেন কাজ চলেছে, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দায়িত্ব নিতে হবে আহতদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার। পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে জোরদার করতে হবে সীতাকুণ্ডের সব শিপইয়ার্ডে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
আমরা চাই না সীতাকুণ্ডে আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক, আর কোনো বাবা মর্গে পাশাপাশি দুই সন্তানের লাশ দেখুক, আর কোনো ভূমিকার সিঁদুর মুছে যাক। এখনই নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। থামাতে হবে মৃত্যুর মিছিল।
