ন্যায্য বিচার ও স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বার্থে কিছু প্রশ্ন
তরিকুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কারণ, সমাজে অন্যায়-অনিয়ম, দুর্নীতি, দখলবাজি কিংবা অপরাধের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো গণমাধ্যম। কিন্তু যখন কোনো সম্পাদক বা সাংবাদিক জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে নিজেই দীর্ঘ আইনি লড়াাইয়ের মুখোমুখি হন, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির সংকট থাকে না; বরং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ন্যায্য বিচার এবং আইনের শাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত আঞ্চলিক দৈনিক সাতনদী পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হাবিবুর রহমানের ঘটনাটি এখন সেই আলোচনারই একটি অংশ। তিনি একটি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে বিচারাধীন। একসময় কয়েক দফায় জামিনের আবেদন করা হলেও, পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বিভিন্ন অজুহাতে শুনানি পিছিয়ে দেন। পরবর্তীতে জামিন আবেদন নামঞ্জুর হলে তাকে কারাগারে যেতে হয়। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভ করে বর্তমানে তিনি মুক্ত অবস্থায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ বিচার এখনও শেষ হয়নি; তিনি আদালতের ওপর আস্থা রেখেই আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন।
এই মামলার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার খলিশাখালী এলাকার বহুল আলোচিত জমিজমা ও মৎস্যঘেরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। স্থানীয়ভাবে অস্ত্রের মহড়া, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেরও যথেষ্ট আলোচনা ছিল।
পরবর্তীতে যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় কামরুল ইসলাম নামে একজন নিহত হন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিহতের স্ত্রী হত্যা মামলা দায়ের করেন এবং একাধিক ব্যক্তির পাশাপাশি সম্পাদক হাবিবুর রহমানকেও আসামি করা হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, যৌথ অভিযানের সময় গণপিটুনির ঘটনা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের বিষয়সহ ভিন্ন প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ফলে ঘটনার একাধিক বর্ণনা বিদ্যমান, যার প্রকৃত সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের।
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। একজন সম্পাদককে সংবাদ প্রকাশের জের বা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে একটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত করার ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে? তিনি কি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, নাকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অন্য কোনো প্রেক্ষাপট থেকে এসেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু তদন্ত, সাক্ষ্য এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। আইন বলে, আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হন। এই নীতিই সভ্য বিচারব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
হাবিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে একজন আঞ্চলিক সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। একজন সম্পাদক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জনগণের সামনে তুলে ধরা। যদি কোনো সংবাদ প্রকাশের কারণে তিনি হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন, তবে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। আবার যদি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকে, তবে সেটিও আদালতের সামনে উপস্থাপিত হওয়া উচিত। তাই এই মামলায় আবেগ নয়, তথ্য ও আইনের শাসনই হওয়া উচিত একমাত্র ভিত্তি।
বর্তমানে তিনি জামিনে মুক্ত রয়েছেন এবং নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেওয়ার পাশাপাশি আইনজীবীদের মাধ্যমে নিজের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ মামলায় জড়ানোর কারণে একজন সম্পাদক হিসেবে তার সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত সুনাম ও আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তবুও, এটি প্রমাণ করে যে তিনি বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেননি; বরং আদালতের প্রতি আস্থা রেখেই নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যেক নাগরিকের মতো তারও ন্যায্য ও দ্রুত বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটিও একই আইনি মানদণ্ডে বিচার হওয়া উচিত। সাংবাদিক হওয়ার কারণে তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন, আবার সাংবাদিক হওয়ার কারণেই যেন অযৌক্তিক হয়রানির শিকার না হন- এই ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশেও সময়ে সময়ে এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে সাংবাদিকদের জড়িত কোনো বিচারাধীন মামলায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখার জন্যও জরুরি।
আজকের প্রশ্নটি শুধু হাবিবুর রহমানকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হলো- একজন সাংবাদিক বা সম্পাদক যদি জনস্বার্থে কাজ করেন, তাহলে তার আইনি সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত? আবার কোনো অভিযোগ উঠলে সেটির নিরপেক্ষ তদন্ত কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়? এসব প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথ আরও সুদৃঢ় করবে। বর্তমানে হাবিবুর রহমান জামিনে মুক্ত থেকে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন তার ভাগ্য নির্ধারণ করবে আদালত, আর আদালতের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। তাই প্রত্যাশা একটাই- বিচার হোক দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রমাণভিত্তিক। যদি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আর যদি তদন্ত ও বিচার শেষে অভিযোগের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে তিনি আইনের মাধ্যমে পূর্ণ ন্যায়বিচার লাভ করবেন। কারণ ন্যায়বিচারের প্রকৃত শক্তি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিজয়ে নয়; সত্য ও আইনের প্রতিষ্ঠায়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচারব্যবস্থার মর্যাদা- দু’টিই একটি সভ্য রাষ্ট্রের অপরিহার্য ভিত্তি। তাই এই মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি শুধু একজন সম্পাদকের ভবিষ্যৎ নয়, আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাকেও আরও শক্তিশালী করবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
