এলডিসি উত্তরণ : প্রস্তুতির এখনই সময়

ড. মো. আবু তালেব

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সাল একটি ঐতিহাসিক বছর। দীর্ঘ পথচলার পর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে জাতির জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু এই উত্তরণ শুধু আনন্দের নয়, এটি বড় দায়িত্বেরও নাম। কারণ এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক আন্তর্জাতিক সুবিধা কমে যাবে। তাই এখনই সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার সময়।

জাতিসংঘ ১৯৭১ সালে এলডিসি শ্রেণি চালু করে। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রায় পাঁচ দশক পর দেশটি এই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক। বাংলাদেশ তিনটি সূচকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। এগুলো হলো- মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। জাতিসংঘের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বর্তমানে দুই হাজার ডলারের বেশি। স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র কয়েক বিলিয়ন ডলার। এখন তা চার শত বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। গত দুই দশকে গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬ শতাংশের ওপরে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত।

বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। কিন্তু এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি খাতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই সুবিধার একটি বড় অংশ কমে যেতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্ক সুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যয় ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে তৈরি পোশাক শিল্প চাপের মুখে পড়বে। তাই এখন থেকেই বাজার ও পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এটি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা। দেশে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। কারণ শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সমন্বয় নেই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, রোবটিকস, ডাটা সায়েন্স এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় চার কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে তা অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হবে। অন্যথায় এটি বড় বোঝায় পরিণত হতে পারে। কৃষিও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এখনো দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কৃষিজমি কমছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, গবেষণা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সম্প্রসারণ করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নেও আরও গুরুত্ব দিতে হবে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের পর বৈদেশিক ঋণের ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমানে অনেক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সহজ শর্তে ঋণ দেয়। উত্তরণের পর সেই সুবিধা কমে যেতে পারে। ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হতে হবে। কর আদায় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং সুশাসনের সংকট মোকাবিলা করতে হবে। দুর্নীতির কারণে উন্নয়নের সুফল অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। বিনিয়োগকারীরাও নিরুৎসাহিত হন।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনও বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি। প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কারণে বিপুল ক্ষতি হয়। এলডিসি উত্তরণের পর জলবায়ু তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। তাই এখন থেকেই পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

এলডিসি উত্তরণ কোনো গন্তব্য নয়। এটি নতুন যাত্রার শুরু। শুধু পরিসংখ্যানের উন্নতি দিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা। বাংলাদেশ এরই মধ্যে অনেক বাধা অতিক্রম করেছে। দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন সেই অর্জনকে টেকসই করা।

এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি জাতীয় সাফল্য। কিন্তু সাফল্য ধরে রাখতে হলে প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতি প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। তাই এলডিসি উত্তরণের এ সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত, প্রস্তুতির এখনই সময়।

লেখক : সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়