মজ্জাগত ভীতি, কৌশলগত দুর্বলতাই ইংরেজি ও গণিতে ব্যর্থতার কারণ
অলোক আচার্য
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
গণিত এবং ইংরেজিতে দুর্বলতা যেন আমাদের শিক্ষার্থীদের পিছু ছাড়ছে না। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলেই বেড়িয়ে আসে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে দুর্বলতার একটি পরিসংখ্যানিক চিত্র। যদিও প্রতিটি অবিভাবকই নিজের সন্তানদের পড়ালেখার একটি অংশ শুধু গণিত ও ইংরেজি পড়াতেই খরচ করেন। স্কুল-কলেজে গুরুত্বারোপ করা হয় এ দুই বিষয়েই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে খারাপ করার খবরই শোনা যায়। এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অবস্থা। প্রশ্ন হলো- এতসব করেও কেন একজন ছাত্রছাত্রীকে এ দুই বিষয়ে দক্ষ বা উপযুক্ত করে তোলা যাচ্ছে না সেই প্রশ্ন এখন সামনে।
এর জন্য কাউকে এককভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। কারও একার উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। কথা বলতে হবে পদ্ধতিগত পরিবর্তনে। সমস্যা সমাধানে এর গোড়ায় পৌঁছাতে হবে। ইংরেজি একটি ভাষা এবং দ্বিতীয় ভাষা এবং গণিতও এক ধরনের ভাষা। এ ভাষা শিখতেই যা তা অবস্থা হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষার আগে সবচেয়ে টেনশনের কারণ হয় ইংরেজি এবং গণিত পরীক্ষার আগের রাত! অভিভাবকদের উদ্বিগ্নতার কারণ থাকে এই দুই বিষয়। সাজেশনের কেন্দ্রে থাকে এ দুই বিষয়। তারপরও কেনো এ দুই বিষয়েই আমাদের ছেলেমেয়েদের দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে তার কারণগুলো বের করার এবং সমাধান করার সময় এসেছে। সবাইকেই পারত হবে বিষয়টা এরকম নয়। কিন্তু অধিকাংশেরই তো দক্ষতা থাকা উচিত।
শিক্ষার্থীদের গণিত ভীতি কাটেনি বা কাটছে না। সূত্রের বলয়েই আবদ্ধ থাকছে ছাত্র জীবন। গণিত বিষয়টা মজার করে তোলার কত আধুনিক পদ্ধতি এখন বের হয়েছে। শিক্ষকদের সেসব বিষয়ের প্রশিক্ষণে বিস্তারিত থাকে। সেই পদ্ধতিগুলো ক্লাসে কতজন প্রয়োগ করছেন সেটা একটা প্রশ্ন। গণিত অলিম্পিয়াড এখন গণিত উৎসবের নাম। গণিত মানে ভীতি নয়, আনন্দ সেই মূলমন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় এখানে। কিন্তু গণিত আনন্দময় হয়ে উঠছে কম সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে। অর্থাৎ এতকিছুর পরেও শিক্ষার্থীদের কাছে গণিত আগের মতোই কঠিন বিষয়। যদিও গণিত শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ করে তোলার জন্য বহু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। উপকরণের যথেষ্ট ব্যবহার, গণিত অলিম্পিয়াড ইত্যাদি এসবের মধ্যে অন্যতম। এতে যে একেবারেই কিছু হয়নি তা নয়। তবে যারা গণিতে ভয় পায় তারা কিন্তু সেখান থেকে খুব একটা বের হতে পারেনি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণিতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায় থেকে গণিতের দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলাফলের পেছনে মুখ্য কারণ। শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজি এবং গণিত বিষয় দুটিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা। বছরব্যাপী প্রাইভেট পড়ান, কোচিং করান। এমন শিক্ষার্থী খুব কম পাওয়া যাবে যে গণিত বিষয় অন্তত কয়েকমাস প্রাইভেট পড়েনি বা কোচিং করেনি।
যেসব বছর পাবলিক পরীক্ষার ফল তুলনামূলকভাবে খারাপ হয় সেক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ইংরেজি এবং গণিত বা কোনো একটা বিষয়ের ব্যর্থতা রয়েছে। সম্ভবত প্রচলিত ধারণাতেই ছাত্রছাত্রীরা এটিকে ভীতির চোখে দেখে। এই ভীতির শুরু হয় শিশুকাল থেকেই। গণিত কঠিন এই ধারণাটি শিশুর পরিবার থেকেই দেওয়া হয়। উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের উপর দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। বছর বছর পাবলিক পরিক্ষাতেও গণিত বিষয়ের ফল আশানুরূপ নয়।
গ্রাম ও শহরের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে গণিত বিষয়ের দক্ষতায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যের বিষয়ে চোখে পরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরিক্ষায়। বছর বছর ইংরেজি বিষয়ের প্রাইভেট পড়ার পরেও কেনো গণিত বিষয়ের ফল খারাপ হয় তা নিয়ে আরও অধিক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। গবেষণা হচ্ছেও। ইংরেজি ও গণিত ভীতি কাটাতে হবে একেবারে শিশুকাল থেকে। এর একটি কারণ হলো প্রাইভেট পড়ার বিষয়টা কেবল সিলেবাস শেষ করার মধ্যেই সিমাবদ্ধ থাকে। প্রকৃতপক্ষে গণিত শেখার ধারে কাছেও যায় না।
আমাদের চারপাশ থেকে শিশুকাল থেকেই আরও সহজভাবে গণিত ও ইংরেজি শেখার কাজটি করা সম্ভব হয়। পাশ করার জন্য যতটুকু শেখার দরকার ততটুকু শিখেই শেখার কাজ শেষ করে ছাত্রছাত্রীরা। মূলত টার্গেটটা থাকে পরীক্ষায় ভালো ফল করা, বিষয় শেখা নয়। কিছু প্যারাগ্রাফ, কম্পোজিশন বা গ্রামারের নিয়ম শিখে পরীক্ষায় তো পাস করাই যায় কিন্তু শেখা বলতে যা বোঝায় সেটি আর হয় না। কারণ ততদিনে বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে যায় তার কাছে। একই কথা গণিতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিছু সূত্র মুখস্ত করে, একই অংক বারবার প্রাকটিস করে এবং শিক্ষকের সাজেশনে তো ক্লাস পরীক্ষায় ঠিক উতরে যাচ্ছে, সমস্যায় পরছে যখন প্রশ্ন সেই ক্লাস টিচার করছেন না, বাইরের কেউ করছেন। কারন সেই ছাত্রটি এতদিন না বুঝে অথবা কিছুটা বুঝে অংকগুলো করেছিল ফলে পাবলিক পরীক্ষায় সে খারাপ করছে।
গণিত বুঝে করা বা আনন্দে করার মতো কোনো ঘটনা তার জীবনে ঘটছে না। প্রকৃতির বহু উপাদানের সাথে মিশিয়ে আরও সহজ করা যায় গণিত। আরও একটি কারণ রয়েছে এই দুই বিষয়ের কাঠিন্যের বিষয়ে। সেটি হলো সেই ছোটোবেলা থেকেই আমরা এটাই শুনেছি ইংরেজি ও গণিত হলো কঠিন সাবজেক্ট। শিক্ষা জীবনে এ কথা শোনেনি এমন কোনো ছাত্রছাত্রীকে পাওয়া যাবে না। পেলে সেই হবে একমাত্র ব্যতিক্রম। এটা শিশুর অভিভাবক বলেছে, ক্লাসের স্যার বলেছে মোট কথা সবাই এই কথা বলেই বড়ো করেছে।
অর্থাৎ শিখতে যাওয়ার আগেই তাকে এ দুই বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং কোনোভাবে পাস করতে পারলেই যে মুক্তি ঘটবে এ দীক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনা যারা কাটিয়ে উঠতে পারছে তারা ইংরেজি ও গণিতে ভালো করছে। যারা পারছে না তারা গুলিয়ে ফেলছে। এত এত প্রচেষ্টা কোনো কাজে আসছে না। আপনি চাকরির বাজারে যান। চাকরি করতে গিয়ে ইংরেজিতে সহজ উত্তরটুকু অনেক উচ্চ শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থী দিতে পারছেন না। সহজ গাণিতিক সমাধান করতে পারছেন না।
সত্যি বলতে ততদিনে আবার শেখার মতো না থাকে মনের অবস্থা আর না থাকে সময়। ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন স্তরে যেসব শিক্ষক নিয়োজিত আছেন তারা নিজেরা কতটা এ দুই বিষয় শেখাতে দক্ষ সেটাও যাচাই করা জরুরি। যেখানে ঘাটতি থাকবে তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পূরণ করা যেতে পারে। যতদিন এই দুই বিষয় শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ বলে বোঝানো যাবে না ততদিন এটি কঠিন এবং দূরের একটি বিষয় হিসেবেই থেকে যাবে। খুব সিম্পল একটা পরীক্ষা করতে পারেন। আপনি যে কোনো ক্লাসের একটি শিক্ষার্থীকে তার যে কোনো একটি বই আনতে বলবেন সেই শিক্ষার্থী নিশ্চিতভাবেই বাংলা বা ধর্ম নিয়ে আসবে।
কারণ এসব বিষয় ওদের মাথায় সহজ হিসেবেই ঢোকানো হয়েছে। এসব প্রাইভেটও পড়তে হয় না এবং অতিরিক্ত সময়েরও দরকার হয় না। মোট কথা যখন একটি মস্তিষ্ক একটি বিষয়কে জটিল হিসেবে টেনে নিচ্ছে সেই মস্তিষ্ক থেকে সেই বিষয় সহজ করা অতটাও সহজ কথা না। তা সে যত কৌশল প্রয়োগ করা হোক না কেন। তাই প্রথম কাজই হবে মাথায় এটা ঢুকিয়ে দেওয়া যে এই দুটি বিষয় বাংলার মতোই একটি সহজ বিষয়। শুধু শেখার পদ্ধতিটা ভিন্ন। এরপরের কাজটা হবে শিক্ষাটা আনন্দময় করে তোলা। মাধ্যমিক পর্যায়ে শহরাঞ্চল বাদ দিয়ে খুব কম শিক্ষকই রয়েছে যারা গণিত বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ বা শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ করে তুলতে পারেন। একথা ঠিক যে এই শিক্ষকরাই শ্রেণিকক্ষে গণিত বিষয়ের পাঠদান করান। তাদের যথেষ্ট সুনামও রয়েছে। তিনি যেটা করেন তা হলো বিদ্যালয়ের সিলেবাস শেষ করেন। সিলেবাস শেষ করা এবং শেখানো এ দুইয়ের ভিতর বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। গণিত বিষয়ের দক্ষতার অভাব আমাদের মজ্জাগত। দুইশ বছরের শাসন শেষেও ইংরেজি ভাষাটা সবাই রপ্ত করতে পারিনি।
চর্চার অভাবেই গণিত ভীতি আমাদের শিক্ষার্থীদের মন থেকে যেন কাটছেই না। কোন পাঠদানের মূল উদ্দেশ্য থাকে পাঠের বিষয়বস্তু অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর বোধগম্য করে তোলা। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর মেধাই সমান নয়। কোন ছাত্রছাত্রীদের সেভাবে অভ্যস্ত করতে পারেন তবে পাঠের উদ্দেশ্য সফল হতে পারে। একজন দক্ষ এবং বুদ্ধিমান শিক্ষক এই বিষয়টির উপরই বেশি জোর দেবেন। এতে লাভ হবে বহুমুখী। একদিকে যেমন শিক্ষক নিজ বিষয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারবেন ঠিক সেভাবেই শ্রেণিকক্ষেও ছাত্রছাত্রীদেরও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে থেকে গণিত ও ইংরেজি ভীতি দূর হবে এবং অন্য বিষয়ের মতই বুঝতে পারবে।
একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যেন ইংরেজি ও গণিতের প্রতি ছাত্রছাত্রীর ভীতি কাটতে থাকে। এ ছাড়া বাড়িতে অভিভাবক সন্তানকে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে চাপ না দিয়ে তাকে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে ভূমিকা পালন করতে পারেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
