শিশু আইন প্রয়োগ ও বাস্তবতা
নুসরাত জাহান স্মরনীকা
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি শিশুর শৈশব অনেকটা সাদা কাগজের মতো। সেখানে যে রং পড়বে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করে ভবিষ্যতের মানুষটি কেমন হবে। অথচ আমাদের সমাজে সেই সাদা কাগজেই কখনও শ্রমের দাগ, কখনো নির্যাতনের ক্ষত, আবার কখনো অবহেলার কালো ছাপ পড়ে। শিশুদের অধিকার রক্ষায় দেশে আইন আছে, নীতিমালা আছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও আছে। কিন্তু আইনের পাতায় যে সুরক্ষা শিশুর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে, বাস্তব জীবনে তার কতটুকু পৌঁছাতে পেরেছে? বাংলাদেশে শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য রয়েছে শিশু আইন ২০১৩। এ আইনে শিশুর সংজ্ঞা, শিশুদের জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থা, শিশুর নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের প্রতি মানবিক আচরণের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশ শিশু অধিকার সনদের সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ। অর্থাৎ শিশুর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের নীতিগত অবস্থান দুর্বল নয়। দুর্বলতা বরং দেখা যায় আইন ও বাস্তবতার মাঝখানের বিশাল দূরত্বে। একদিকে আমরা বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। অন্যদিকে সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে দেখা যায় রাস্তায় কাজ করতে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শ্রম দিতে কিংবা পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে। অনেক শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সে জীবিকার তাগিদে দোকান, কারখানা, হোটেল কিংবা পরিবহন খাতে কাজ করছে। কেউ কেউ আবার রাস্তায় দিন কাটাচ্ছে। তাদের অনেকের কাছেই ‘শৈশব’ শব্দটি যেন বিলাসিতা। শিশু নির্যাতনের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা, অনলাইন হয়রানি বিভিন্নভাবে শিশুর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে নির্যাতনের অনেক ঘটনা পরিবার বা সামাজিক চাপে প্রকাশ্যে আসে না। ফলে সরকারি হিসাব কিংবা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো বাস্তব চিত্রের পুরোটা তুলে ধরে না।
আইন থাকার পরও কেন এমন হচ্ছে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে আইনের দুর্বল প্রয়োগ। একটি আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান, জনবল, অর্থ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত থাকে। শিশুদের জন্য আলাদা আদালত বা শিশু-সংবেদনশীল বিচারব্যবস্থার কথা বলা হলেও সব জায়গায় একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে একটি শিশুকে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা সামাজিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে সচেতনতার অভাব। অনেক অভিভাবকই জানেন না, শিশুর ওপর কোন আচরণটি শাসন আর কোনটি নির্যাতন। আমাদের সমাজে এখনও অনেকেই মনে করেন, শিশুকে মারধর করে ‘শিক্ষা দেওয়া’ স্বাভাবিক। অথচ একটি শিশুর মানসিক বিকাশের ওপর এমন আচরণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, সেই আইন সম্পর্কে পরিবার, শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। দারিদ্র্যও শিশু অধিকার বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা। একটি পরিবারের যখন দুবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে, তখন শিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর বদলে কাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত অনেক সময় তাদের কাছে বাস্তব প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। তাই শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে শুধু নিয়োগকর্তাকে শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, দরিদ্র পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা অনেক সময় শিশুকে পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল পরিবারের সদস্য কিংবা ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে দেখি। ফলে তার বর্তমান নিরাপত্তা, মতামত, মানসিক সুস্থতা কিংবা মর্যাদাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ শিশুর অধিকার কোনো ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি নয় এটি তার বর্তমানের অধিকার। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই শিশু আইন বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শিশুদের জন্য পৃথক ও শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। থানায়, আদালতে, হাসপাতাল ও সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের শিশু-সংবেদনশীল আচরণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নির্যাতনের অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত ও বিচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে শিশুর নিরাপত্তা ও মানসিক অবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একই সঙ্গে শিশুশ্রম বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আরও কার্যকরভাবে আনতে হবে। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্ত করে তাদের পুনঃরায় শিক্ষার আওতায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। অনলাইন জগতেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুর প্রতি আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একটি শিশুকে শুধু ‘ভবিষ্যতের নাগরিক’ হিসেবে দেখলে চলবে না, তাকে আজকের মানুষ হিসেবেও দেখতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
