বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে কিছু কথা

আবদুল কাদের জীবন

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। জীবিকার তাগিদে, চিকিৎসার প্রয়োজনে, উচ্চশিক্ষা কিংবা উন্নত জীবনের আশায় প্রতিবছর অসংখ্য বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তারা কতটা নিরাপদ- এ প্রশ্নের উত্তর বরাবরই অস্পষ্ট। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করে তুলেছে। বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকায় ঘাটতি আছে।

সম্প্রতি কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয় বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়। তারা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কলকাতায় গিয়েছিলেন। স্বজনদের কাছে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ফিরে আসার কথা ছিল তাদের; কিন্তু একটি আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিল ছয়টি প্রাণ। এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, বরং বিদেশে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

শুধু কলকাতার ঘটনাই নয়, বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের দুর্ভোগের আরও নানা চিত্র আমরা প্রায়ই দেখতে পাই। ৭ আগস্ট ইতালির একটি বিমানবন্দরে ঢাকাগামী প্রায় ২৫০ যাত্রী বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘ ২৮ ঘণ্টা আটকা পড়ে থাকার খবর সামনে আসে। দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে আটকে থাকা যাত্রীদের অনেকেই মেঝেতে শুয়ে-বসে সময় কাটাতে বাধ্য হন। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ ছিল আরও বেশি, ইতালিতে। অবস্থানরত বাংলাদেশের দূতাবাস নাগরিকদের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যার কারণে বিমানবন্দরে নাগরিকরা মানবেতরভাবে সময় পার করেছিল। তাই পরিস্থিতিতে বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নাগরিকরা যখন বিপদে পড়েন, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোই তো রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর মূল কাজ কী-প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। একজন বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানো, আইনি সহায়তা দেওয়া, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখা, লাশ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রয়োজনে জরুরি আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা- এসবই কূটনৈতিক মিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ। অথচ অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়, বিপদ ঘটার পর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা ছাড়া কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মুসা সানিয়া শিল্প এলাকার একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। কারখানাটিতে পর্যাপ্ত জানালা ছিল না এবং দিনের বেলায় দরজা বাইরে থেকে আটকে রাখা হতো- এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। যদি কর্মস্থলের নিরাপত্তাব্যবস্থা এতটাই নাজুক হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনের নজরদারি কতটা ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেন। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, কম মজুরি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, আবাসন সংকট এবং নিয়োগকর্তার নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। দুর্ঘটনায় কোনো শ্রমিক মারা গেলে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতেও কখনও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। শোকাহত পরিবারকে তখন প্রিয়জনের লাশ দেশে ফেরানোর জন্য নানা দপ্তরে ছোটাছুটি করতে হয়। এ প্রক্রিয়া যদি অযথা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের পাসপোর্টের দুর্বল অবস্থান। একটি দেশের পাসপোর্টের শক্তি শুধু ভিসা-মুক্ত দেশের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আন্তর্জাতিক আস্থা, কূটনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সুশাসন এবং নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি অংশ বিদেশে অবৈধ উপায়ে প্রবেশ, ভুয়া নথি ব্যবহার, মিথ্যা তথ্য দিয়ে আশ্রয়ের আবেদন কিংবা ভ্রমণ ভিসার অপব্যবহারের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো দেশের নাগরিকদের ওপর পড়ে। ফলে প্রকৃত ও সৎ আবেদনকারীরাও অনেক সময় অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই ও সন্দেহের মুখে পড়েন।

তবে এ দায় শুধু নাগরিকদের নয়; রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী। পাসপোর্ট অফিস থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ঘুষের বিনিময়ে জাল নথির মাধ্যমে কেউ পাসপোর্ট পেয়ে গেলে কিংবা ভুয়া পরিচয়ে বিদেশে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে একজন প্রকৃত নাগরিককে যদি পাসপোর্ট পেতে অযথা হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই পাসপোর্ট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

একটি দেশের পাসপোর্টের মর্যাদা অনেকাংশে নির্ভর করে তার কূটনৈতিক শক্তির ওপরও। শক্তিশালী ও সক্রিয় বৈদেশিক নীতি একটি দেশের নাগরিকদের জন্য বিদেশে নানা সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। বিদেশে বাংলাদেশিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আলোচনা, প্রয়োজন হলে কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় দৃশ্যমান ভূমিকা রাখা দরকার। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলোর তৎপরতা অনেক সময় সাধারণ মানুষের চোখে যথেষ্ট দৃশ্যমান হয় না।

দূতাবাসগুলো শুধু পাসপোর্ট, ভিসা বা কাগজপত্র সংক্রান্ত সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এক ধরনের নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল। কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হলে, কোনো শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে, কোনো পর্যটক দুর্ঘটনায় পড়লে কিংবা কোনো যাত্রী বিমানবন্দরে দীর্ঘসময় আটকা পড়লে দূতাবাসের দ্রুত ও মানবিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাশিত। বিশেষ করে শ্রমঘন দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মস্থল ও আবাসনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

প্রবাসীরা শুধু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস নন; তারা বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবেও বিদেশে অবস্থান করেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থেরও অংশ। একজন প্রবাসী যখন বিদেশের মাটিতে নিরাপদ বোধ করেন, তখন তার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও বাড়ে। বিপরীতে বিপদের সময় রাষ্ট্রকে পাশে না পেলে সেই আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।

সমস্যাগুলোর সমাধান অসম্ভব নয়। দূতাবাসগুলোতে ২৪ ঘণ্টার জরুরি হেল্পলাইন, দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা ব্যবস্থা, প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থল পরিদর্শন, আইনি সহায়তা, লাশ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বিমানবন্দর বা ইমিগ্রেশন সমস্যায় তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও বিদেশে আইন মেনে চলতে হবে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তাদের অধিকার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে শুধু দেশের সীমানার ভেতরে নিরাপত্তা দেওয়া নয়, দেশের বাইরে বিপদের সময়ও তার পাশে দাঁড়ানো। দূতাবাসগুলো যদি আরও সক্রিয়, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক হয় এবং নাগরিকরাও দায়িত্বশীল আচরণ করেন, তাহলে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও নাগরিকদের নিরাপত্তা- দুটিই শক্তিশালী করা সম্ভব।

এখন সময় এসেছে প্রশ্ন করার পাশাপাশি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ বিদেশে একজন বাংলাদেশির বিপদ মানে শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, একটি দেশের মর্যাদা এবং কোটি মানুষের প্রত্যাশা। প্রবাসীদের নিরাপত্তায় আর উদাসীনতা নয়- প্রয়োজন দৃশ্যমান, কার্যকর ও দায়িত্বশীল কূটনীতি।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।