সমৃদ্ধ বাউল রবীন্দ্রনাথ
ডা. শহীদুল্লাহ্ সিকদার
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাউলরা সবাই কমবেশি সমৃদ্ধ। মননের উন্নয়ন বা সমৃদ্ধি ছাড়া বাউল হওয়া সম্ভব নয়। সাধারণভাবে মানুষ বাউলদের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ভাবে। তাদের পোশাকে, চলনে, বলনে একটি দারিদ্র্যের ভাব রয়েছে। আসলে এই দারিদ্র্যই তাদের সমৃদ্ধি দিয়েছে। তাবৎ দুনিয়ার সব বিত্ত-বৈভব, অর্থ-সম্পদ, দালান-কোঠা বা বাহ্যিক বাস্তববাদী ঐশ্বর্য তাদের টানতে পারে না বা আটকাতে পারে না। দুনিয়ার সব ভোগ-বিলাসী সামগ্রীর স্থূল মোহ তাদের কখনোই উদার চর্চার মাধ্যমে জীবনের প্রকৃত রসাস্বাদন থেকে বিরত করতে পারে না। মনুষ্যজীবন ক্ষণস্থায়ী। এখানে জীবনের সার্থক ব্যবহারের কোনো নির্ণায়ক একক নেই। অনন্তকাল ধরে খুঁজেও তার শেষ সন্ধান পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তাই বলে জীবনের সর্বোত্তম ব্যবহার করার চেষ্টা করা যাবে না এবং তা অব্যাহত থাকবে না-এমনটি নয়। বাউলদের দর্শন খুব নির্মোহ, নিষ্পাপ এবং সংসারত্যাগী মানবিক চেতনায় সমৃদ্ধ। সেখানে গান, দেহতত্ত্ব, সৃষ্টির রহস্য ও মানবকল্যাণের বিভিন্ন বিষয় চর্চা হয়, যা কোনো অর্থমূল্যে বিবেচনা করা যায় না। কিন্তু বাউলরাও মানুষ। তারা কোনো অতিমানব নয়। বাউল হয়ে কেউ জন্মায় না। সমাজে যেমন অনেক পেশা বা জীবিকার বিভাজন আছে, জীবন চলার পথেও তেমনি অনেক মতবাদ বিদ্যমান, যার সবই মানুষের জন্য।
শিক্ষা, শিক্ষা-দীক্ষা বা জ্ঞানচর্চারও অনেক পথ রয়েছে। সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডেরও তেমনি অনেক পথ ও দিক রয়েছে। আমরা কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্যচর্চার উপজীব্য বা দর্শন প্রকাশেরও বিভিন্ন ধারা দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি নন, তিনি বাংলা ভাষায় আমাদের সংস্কৃতির মৌলিক মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে তার কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চিত্রে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাঙালির জীবনধারার যে আদি মানবিক উদারনৈতিক শক্তি, তা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। অনেকে রুশসাহিত্যিক তলস্তয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের লেখার মিল খুঁজে পান। কিন্তু লিও তলস্তয়ের সৌভাগ্য হয়নি পদ্মা, যমুনা, ভাগীরথী বা ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় ঘুরে বেড়ানোর। শুধু তলস্তয় নয়, এই সৌভাগ্য ইংরেজ কবি শেলি বা বায়রন, কারও হয়নি। তাদের দেখা হয়নি লালন, গগন হরকরা বা এমন অসংখ্য বাঙালির মরমি কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকের সঙ্গে। পরিচয় হয়নি তাদের গান, সুর, গল্পগাঁথা বা জীবনবোধের সঙ্গে; যা শুধু উন্নত ও সমৃদ্ধই নয়, মহামূল্যবান এক সম্পদ; যা দুনিয়ার অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। রবীন্দ্রনাথ তা খুঁজে পেয়েছেন। খুঁজে পেয়েছেন বললে ভুল হবে। আসলে রবীন্দ্রনাথ তো এ মাটিরই সন্তান। এখানকার আলো-বাতাস, সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, বর্ষায় ভরা নদী, আবার কার্তিকের ক্ষীণকায়, অগভীর হাঁটু-জল নদী, সবই তিনি দেখেছেন। দরিদ্র মাঝির নিরন্তর সংগ্রামের জীবনেও তিনি দরাজ গলায় গান শুনেছেন। ছিন্নবস্ত্রের যে মা জীর্ণ ঘরে বসে পরিবার-পরিজনের অপেক্ষায় উদাস নয়নে প্রহর গুনেছেন, তা তিনি হৃদয় দিয়ে দেখেছেন। মনের গভীরে এমন যাতনা তৈরি হয়েছে, যা শুধু ব্যতিক্রমী অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের পক্ষেই অনুভব করা সম্ভব। সে অনুভব তাকে ব্যথিত করেছে, আন্দোলিত করেছে, ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছে এবং মমতাময় এক অনন্য সমৃদ্ধি দান করেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে ‘রবি বাউল’ বলে পরিচয় দিতেন। জমিদারি তদারকির জন্য তাকে শিলাইদহে, পতিসরে বা শাহাজাদপুরে বেশ কিছুদিন থাকতে হয়েছে। সেখানে তিনি বাউলদের সংস্পর্শে আসেন। খুব কাছ থেকে তাদের জীবনধারা ও সংগীতচর্চায় মগ্ন থাকার এক অন্য জগতের সন্ধান লাভ করেন তিনি। ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ডে বাংলার বাউলসংগীতের ওপর একটি বক্তব্য প্রদান করেন, যা পাশ্চাত্যে সাড়া ফেলেছিল। ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে’ অথবা ‘আজ তোর মরা গাঙে বান এসেছে, জয় মা বলে ভাসা তরী’ অথবা ‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়...তারই লাগি যত ফেলেছি অশ্রুজলে’-এর মতো অনেক হৃদয়গ্রাহী সংগীত তিনি সৃষ্টি করেছেন। যা শুধু তার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে; অন্য কোনো সংগীতজ্ঞ বা কবি-সাহিত্যিকের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। রবীন্দ্রনাথের ৬৬টি গান একেবারেই বাউল আঙ্গিকে রচিত। এর বাইরেও অন্যান্য অনেক গান, কবিতা ও ছোটগল্পে তার বাউল হৃদয়ের পরিচয় মেলে। অন্য বাউলদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য হলো, তিনি প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক শিল্পী-সাহিত্যিকের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তার শিক্ষা, দীক্ষা ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ছিল অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ। যার ফলে তার বাউল জীবনেও অনন্য এক মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের বাউলসংগীতের শব্দচয়ন অপরাপর বাউল সংগীতশিল্পীদের চেয়ে ব্যতিক্রমীভাবে অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী। এর কারণ, তিনি অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন শক্তিধর শব্দপ্রয়োগ এবং নিজস্ব সুরকে ধারণ ও বহুমাত্রিক অর্থপ্রকাশে সক্ষম পংক্তিমালার মাধ্যমে বাউলসংগীত সৃষ্টি করেছেন। তিনি নিজে লিখেছেন, সুর করেছেন এবং অনেক গান নিজেই পরিবেশন করেছেন। যার ফলে তার বাউলগান শুধু অপরাপর বাউলদের চেয়ে আলাদা মানেরই নয়, এর গুরুত্ব ও আবেদনও অনেক বেশি। সম্ভবত যতদিন বাঙালি সমাজ থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথের এ বাউলসংগীতগুলো বাংলার মানুষ হৃদয় ভরে উপভোগ করবে। ব্যতিক্রমী শব্দচয়ন ও সুরারোপের মাধ্যমে বাউলসংগীতে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা অবশ্যই অনন্য, অসাধারণ; যা কেবল একজন উন্নত সমৃদ্ধ বাউলের পক্ষেই সম্ভব।
আজ বাইশে শ্রাবণ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। বাংলা ১৩৪৮ সালের এ দিনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের এই অসামান্য সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক : সাবেক উপ-উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
