জীবনযাত্রার পরিবর্তনে বাড়ছে অসংক্রামক রোগ

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় মানুষের প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল সংক্রামক রোগ। কলেরা, গুটি বসন্ত, যক্ষ্মা কিংবা ম্যালেরিয়ার মতো রোগ অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এসব রোগের প্রকোপ এখন অনেকটাই নিয়স্ত্রণে এসেছে। কিন্তু একই সময়ে নীরবে বিস্তার লাভ করেছে আরেকটি বড় সংকট। যা অসংক্রামক রোগ নামে পরিচিত। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও কিডনি রোগ আজ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব রোগের বিস্তারের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে আমাদের পরিবর্তিত জীবনযাত্রা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু হৃদরোগেই প্রাণ হারান প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানিয়েছে, এসব মৃত্যুর প্রায় ৭৭ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মতো দেশগুলোতে। বাংলাদেশও এই বাস্তবতা অতিক্রম করে নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি এখন অসংক্রামক রোগজনিত। অর্থাৎ সংক্রামক রোগের চেয়ে জীবনধারাজনিত রোগ এখন আমাদের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

অসংক্রামক রোগ হঠাৎ করে হয় না; বছরের পর বছর ধরে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ফল হিসেবে এগুলো ধীরে ধীরে মানব শরীরে বাসা বাঁধে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার অভ্যাস, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ধূমপান এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, এসব কারণ মিলেই আজকের এ নীরব স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করেছে। নগরায়ণ ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবন আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে কর্মক্ষেত্রে কিংবা দৈনন্দিন চলাফেরায় মানুষের শারীরিক পরিশ্রম বেশি ছিল। এখন অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা, বাড়ি ফিরে স্মার্টফোন বা টেলিভিশনের সামনে সময় কাটানো এবং যাতায়াতে হাঁটার পরিবর্তে মোটরযানের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Global Status Report on Physical Activity অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রম করেন না। এ নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। একসময় ঘরে রান্না করা সুষম খাবারই ছিল মানুষের প্রধান খাদ্য। বর্তমানে তার জায়গা দখল করে নিয়েছে ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো বাংলাদেশেও গড় লবণ গ্রহণ এই সীমার চেয়ে অনেক বেশি। অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্সফ্যাট স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের অন্যতম কারণ। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহারও অসংক্রামক রোগের একটি বড় ঝুঁকির কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তামাক প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়।

ধূমপান শুধু ফুসফুসের ক্যানসার নয়; এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ এবং মুখগহ্বরের ক্যানসারের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে বায়ুদূষণও এখন অসংক্রামক রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। The Lancet Commission on Pollution and Health এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দূষিত বায়ু হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, অসংক্রামক রোগ এখন আর শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশু ও তরুণদের মধ্যেও স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস দ্রুত বাড়ছে। স্মার্টফোন, অনলাইন গেম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে শিশুদের খেলাধুলা কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। ফলাফল হিসেবে অল্প বয়সেই নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মানসিক চাপও অসংক্রামক রোগের একটি নীরব কারণ।

চাকরির অনিশ্চয়তা, শিক্ষাজীবনের প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং ডিজিটাল জীবনের অতিনির্ভরতা মানুষের মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ঘুমের সমস্যা এবং বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সুস্থ জীবনযাপনের জন্য শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অসংক্রামক রোগ শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য নয়, দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করে।

দীর্ঘদিন চিকিৎসা, নিয়মিত ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস একটি পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে। বিশ্বব্যাংক বারবার উল্লেখ করেছে, অসংক্রামক রোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথেও এটি একটি প্রতিবন্ধক। তবে অধিকাংশ অসংক্রামক রোগ-ই প্রতিরোধযোগ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তামাক বর্জন, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে অসংক্রামক রোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা যায়।

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, মৌসুমি ফল ও শাকসবজি খাওয়া, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা এবং বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করার মতো সহজ অভ্যাসও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এখন সময় এসেছে চিকিৎসাকেন্দ্রিক নয়, প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার।

স্কুল পর্যায় থেকে স্বাস্থ্যশিক্ষা, নিরাপদ হাঁটার পথ, খেলার মাঠ সংরক্ষণ, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে উৎসাহ এবং গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে।