নদী বাঁচলেই বাঁচবে বাংলাদেশ
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নদীমাতৃক বাংলাদেশ, কথাটি কি শুধু আমাদের ভৌগোলিক পরিচয়কে প্রকাশ করে? বলার অপেক্ষা রাখে না, এ পরিচয় আমাদের দেশের প্রাণের স্পন্দন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ভিত্তি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এ পরিচয় আজকের দিনে বেমানান হয়ে উঠছে। কেননা, নদীগুলো মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
দেশের প্রধান অর্থনৈতিক প্রাণপ্রবাহ কর্ণফুলী নদীর দখল, দূষণ ও নাব্যের যে পরিস্থিতির কথা জানা যাচ্ছে, তা চরম উদ্বেগের। আমরা জানি, কর্ণফুলীর সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা জাতীয় উদাসীনতা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নেরই ফল। এ চিত্র শুধু কর্ণফুলীর একারও নয়। সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় সব নদীর ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কর্ণফুলীর পানিতে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। তলদেশে জমেছে বর্জ্যরে ঘন আস্তরণ। শহরের নালা ও খালগুলো পরিণত হয়েছে গৃহস্থালি ও শিল্পের বিষাক্ত রাসায়নিক বহনের প্রধান মাধ্যমে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর। বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির বহু মাছ। হুমকির মুখে পড়ছে সার্বিক জলবায়ু। শুধু তাই নয়, দখলের কবলে পড়ে নদীর স্বাভাবিক প্রস্থ নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। উদ্ধার করা জমি বারবার ফের দখলের চক্রে আটকে যাচ্ছে। উচ্ছেদ অভিযান, প্রশাসনিক আশ্বাস আর দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরও থামেনি দখল ও দূষণের ভয়াবহ তাণ্ডব। এ ক্ষেত্রে কর্ণফুলী থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যার মতো সারা দেশের অসংখ্য নদী আজ একইভাবে অস্তিত্ব সংকটে। বলা বাহুল্য, দখল ও দূষণের এই ধারাবাহিকতা নদী রক্ষায় তদারকির চরম ব্যর্থতাকেই জানান দেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ চরম সংকট থেকে নদীকে রক্ষায় করণীয় সম্পর্কে রাষ্ট্র ও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কি সত্যিকারই কোনো মহাপরিকল্পনা বা আন্তরিকতা আছে? যদি থাকে, তাহলে সেসব স্পষ্ট করা উচিত। একই সঙ্গে এসব পরিকল্পনা-নীতি যে শুধু কাগুজে নয়, তার বাস্তবায়নও সম্ভব, কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে তা জনগণকে বোঝানো উচিত। তা না হলে নদী মরে যাওয়ার মিছিল দীর্ঘ হতে থাকবে। প্রায় দেড় হাজার নদীর বাংলাদেশ আজ ৭০০ থেকে ৮০০-তে এসে ঠেকেছে, তাও বর্ষা মৌসুম ছাড়া সক্রিয় নদীর সংখ্যা এর অর্ধেকও নয়।
আমরা মনে করি, নদী রক্ষায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ আবশ্যক। দখলদাররা যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। উদ্ধারকৃত জমি ফের দখল রুখতে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালু রাখতে হবে। নদীর সীমানা সঠিকভাবে চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে করতে হবে সীমানা নির্ধারণ। এ ছাড়া নদী তীরবর্তী বা খালসংলগ্ন সব শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার ব্যবহার হতে হবে বাধ্যতামূলক।
নগরের গৃহস্থালি ও প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে পড়া বন্ধে গড়ে তুলতে হবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কর্ণফুলীকে বাঁচাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, নদী রক্ষা কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সব সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা আবশ্যক। নদীর গতিপথ, নাব্য এবং জলধারণ ক্ষমতা ব্যাহত করে- এমন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে না। স্মরণে রাখতে হবে, নদী শুধুই পানির প্রবাহ নয়। এটি বাণিজ্য, কৃষি ও অস্তিত্বের মূল উৎস। ফলে নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। কারণ নদী বাঁচলেই বাঁচবে বাংলাদেশ।
