ঢাকার বাইরে বাংলাদেশ : উন্নয়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের নতুন ভাবনা

সোনিয়া তাসনিম

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের এ নতুন ভাবনার জগতে প্রবেশের আগে একটু জানব, কী এই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ? ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বলতে যদি মনে করা হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া: তবে তা একদম ভুল বরং বাস্তবটা পুরোই উল্টো। মূলত ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ অর্থ, কেন্দ্রীয় সরকারকে উপেক্ষা করা নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বকে আরও দক্ষ ও জনবান্ধব করে তোলার এক সূক্ষ্ম দূরদর্শী জালের বুননশৈলীর নৈপুণ্য। এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায়, জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বড় বিষয়গুলো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হওয়ার পাশাপাশি, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলো স্থানীয় পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হওয়ার কারণে একটা ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি হতে সক্ষম। যা ভবিষ্যতে সামগ্রিক দেশের জন?্য এক সুবিশাল উন্নয়নের রোডম্যাপ হিসেবে বিবেচিত হবার উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।

আর এটি শুধু কথার কথা নয়। খোদ বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯নং অনুচ্ছেদেও এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সংবিধান মতে, প্রশাসনিক প্রতিটি এককে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখিত রয়েছে। একই সঙ্গে জনসেবা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বের কথাটাও এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট। ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় কর আরোপসহ বাজেট প্রণয়ন ও নিজস্ব তহবিল পরিচালনার দক্ষতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। মানে দাঁড়াচ্ছে, বিকেন্দ্রীকরণ বাংলাদেশের জন্য আদৌ নতুন কোনো উত্থাপিত বিষয় নয়, বরং এর সাংবিধানিক ভিত্তি রাষ্ট্র কাঠামোতেই নিহিত।

আমাদের দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় ঢাকা— তথা রাজধানীর গুরুত্ব ও ভূমিকা অপরিসীম। জাতীয় নীতিনির্ধারণ হতে অর্থনৈতিক-প্রশাসনিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চক্র এই ঢাকাকে ঘিরেই আবর্তিত। তবে, ভুললে চলবে না, দেশের শক্তি শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়- বরং প্রতিটি জেলা, উপজেলা থেকে পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্প্রসারিত। কারণ, এসব এলাকার অনেক মানুষ নিজেদের শ্রম, মেধা ও উদ্যোগের কল্যাণে দেশের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে প্রত?্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছেন। সুতরাং আগামীর বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলতে এই উন্নয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি। আর তা সম্ভবপর একমাত্র ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমেই।

আমাদের এই সাড়ে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল ভূখণ্ডে, স্থানীয় সরকার ব্যাপ্তি কিন্তু বিস্তৃত কলেবরে বিছানো পরিধিবৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৪,৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। সংখ?্যাটা নেহাত কম নয়। এসব সাড়ে চার হাজার সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান কিন্তু খুব সহজে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংযোগ সেতু তৈরিতে সক্ষম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্থানীয় অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এরইমধ্যে বেশ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে।

তবে দায়িত্ব স্থানীয় পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও আর্থিক ক্ষমতার অনেকটাই এখনও কেন্দ্রনির্ভর। যার কারণে প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যাচ্ছে। এটি নিরসনে তাই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্য দায়িত্বের পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সহায়তার সঙ্গে নিজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন আবশ্যক।

আবার অপরপক্ষে, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের প্রয়োজনেও ভিন্নতা রয়েছে। উপকূলীয় এলাকা হতে হাওড়, পাহাড়, চর কিংবা নগরাঞ্চল- প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ুগত কারণে এদের সম্ভাবনা ও সমস্যাগুলোও আলাদা। কোথাও জলবায়ু পরিবর্তন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালে কোথাও বা এই সমস্যা রূপ নিচ্ছে অপ্রতুল অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, কিংবা নগর ব্যবস্থাপনা হতে কর্মসংস্থান বলয়ে। সুতরাং স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়লে এসব ভিন্নতাকে বিবেচনায় নিয়ে সেক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও বাস্তব ও বহুমুখী করে তোলা অসম্ভব নয়।

আর এটিই মূলত- বিকেন্দ্রীকরণের সবচাইতে বড় সম্ভাবনা। কারণ, স্বভাবতই যে কোনো এলাকা বা অঞ্চলের স্থানীয় মানুষ নিজ এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনাকে খুব কাছ থেকে পরখ করে নিতে পারেন। যা বৃত্তের বাইরে থেকে বুঝাটা একটু কঠিণ। তাই, এই ক্ষেত্রে তাদের এলাকা ভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও মতামত মূল পরিকল্পনার সঙ্গে যদি যুক্ত করা যায় তাহলে একটি ফলপ্রসূ উন্নয়ন পরিকল্পনা বেরিয়ে আসা সহজ বৈকি। স্থানীয় বাস্তবতার আলোকে বহুমাত্রিক নানা সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে, রাষ্ট্রের অর্থ ও সম্পদের সুষম সংমিশ্রণ ও ব্যবহারের সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। যা হয়ে উঠতে পারে, দেশের অগ্রগতির এক অন?্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে তোলার কিছু ইতিবাচক অভিজ্ঞতা এর মাঝেই বিদ্যমান। যেমন, ইউনিয়ন পরিষদগুলোর জন্য সূত্রভিত্তিক কেন্দ্রীয় অনুদান বণ্টনের উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে। অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক অর্থায়ন, পরিকল্পনা ও জবাবদিহির কাঠামো শক্ত থাকলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও সচল হয়ে উঠবে।

এক্ষেত্রে প্রযুক্তি এখন এক বিরাট আর্শীবাদ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বর্তমানে স্থানীয় বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যয়ের তথ্য ও নাগরিকসেবা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা এখন খুবই সহজ। অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল নাগরিক সেবা ও তথ্য উন্মুক্ত করার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার হতে পারে আরও বেশি নাগরিকবান্ধব। এতে করে জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগের পথ সুগম হবে।

নেতৃত্বের বিকাশ-বিকেন্দ্রীকরণের আরও একটি অন্যতম ইতিবাচক দিক। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক যোগ্য ও মেধাবী মানুষ জাতীয় পর্যায়ে কার্যকরী নেতৃত্ব প্রদানের সক্ষমতা রাখে। সেক্ষেত্রে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পারে এসব ভবিতব্য নেতাদের তৃণমূল পর্যায় হতে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে দিতে- যাতে করে রাষ্ট্র পরবর্তীতে দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের সুফল ভোগ করতে পারে।

বস্তুত কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতায় একটি কার্যকর উন্নয়ন ও প্রগতিশীল কাঠামো গড়ে তোলাই বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্য। পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, মুদ্রানীতি, বৃহৎ অবকাঠামো কিংবা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মতো সূক্ষ্ম ও অপরিহার্য বিষয়গুলো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হওয়াই স্বাভাবিক। আবার যুগপৎভাবে স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা ও দায়িত্ব অর্পণ করাটাও আবশ্যক।

বাংলাদেশের সম্মুখে আজ উন্নয়নের পাশাপাশি আরও কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ বিদ্যমান। রাজধানী ঢাকাকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনায় রেখে উন্নয়নের শক্তি সম্প্রসারিত করতে হবে দেশের সর্বত্র। রাজধানীর বৃহৎ গ-ীর বাইরে যে সুবিশাল বাংলাদেশ উপস্থিত, যেখানে প্রতিদিন কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা, সেবার এক বৃহৎ কর্মচক্রের মাধ্যমে সমৃদ্ধির দিকে বাংলাদেশ প্রত্যহ ধাবিত হচ্ছে, সেই বিশাল বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় আরও সক্রিয় ও দক্ষ করে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

তবে, শুধু প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বলতে বুঝায় এই বদলের সঙ্গে আরও অনেক কিছুকে। এটি মানুষের সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখার এক বিশেষ দর্শনস্বরূপ। রাষ্ট্র যতই নাগরিকের কাছাকাছি পৌঁছাবে, নাগরিকও ততই রাষ্ট্রের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সক্রিয় হয়ে উঠবে। আগামীদিনের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তাই আমরা বিবেচনা করব, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা- যেখানে উন্নয়ন কথাটি শুধু শহরে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই ছড়িয়ে পড়বে।

পুরো দেশটাই এককভাবে হয়ে উঠবে একটি বিপুল সম্ভাবনার নিজস্ব কেন্দ্র। ঢাকা-মূল চালিকাশক্তি হবে ঠিক- কিন্তু তার সঙ্গে সমন্বয় করে যখন দেশের প্রতিটি অঞ্চল উন্নয়নের শক্তিশালী অংশীদার হয়ে গড়ে উঠবে, তখুনি সমীকরণটা মিলবে যথার্থ অর্থে। কারণ, সেদিনের এই সমন্বিত একক বাংলাদশ, যথার্থই একটি ভারসাম্যপূর্ণ, গণতান্ত্রিক, সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের পরাক্রমশালী ভিত্তি হয়ে উঠবে।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট