পাটের বহুমুখী সর্বোচ্চ ব্যবহার জরুরি
মায়মুনা
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বের উন্নত শিল্পব্যবস্থাগুলো প্রাকৃতিক আঁশকে শুধু সুতা বা কাপড়ের উপাদান হিসেবে দেখে না; গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে তা নতুন শিল্পপণ্যে রূপ দেয়। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার গবেষণাতেও পাটের সূক্ষ্ম সুতা, নকশাদার কাপড়, প্যাকেজিং, ভূ-বস্ত্র, কাগজের মণ্ড ও যৌগিক উপাদানে ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। পাটের আঁশ দিয়ে প্রচলিত বস্তা, দড়ি ও কার্পেটের পাশাপাশি পোশাক, গৃহসজ্জার সামগ্রী, জুতা এবং কারিগরি বস্ত্র তৈরি করা যায়। পাট ও তুলার মিশ্রণে উন্নত বস্ত্র তৈরির সুযোগও রয়েছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে প্রায় ৪০ ধরনের পণ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কথা জানিয়েছে।
পাটভিত্তিক ভূ-বস্ত্র বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সম্ভাবনা। মাটির ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ, নদীর তীর ও বাঁধ সংরক্ষণ, ঢাল রক্ষা এবং অবকাঠামোগত কাজে এটি ব্যবহার করা যায়। নদীভাঙনপ্রবণ বাংলাদেশে বিদেশে রপ্তানির পাশাপাশি নিজেদের অবকাঠামোতেই এর বড় বাজার তৈরি করা সম্ভব। পাটের আরেকটি মূল্যবান সম্পদ হলো- সেলুলোজ। পাটের আঁশ সেলুলোজসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি থেকে মাইক্রোক্রিস্টালাইন সেলুলোজসহ বিভিন্ন উন্নত উপাদান তৈরি করা যায়।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এ ধরনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কথা জানিয়েছে। এসব উপাদানের ব্যবহার- ওষুধ, প্রসাধনী, খাদ্যসহ বিভিন্ন শিল্পে সম্প্রসারিত হতে পারে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত সেলুলোজজাত উপাদান তৈরির মাধ্যমে পাটের মূল্য বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। আর পাটের সেই অংশ, যাকে আমরা সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি পাটখড়ি। আঁশ সংগ্রহের পর পড়ে থাকা এই কাঠি কেবল জ্বালানি নয়; কাগজের মণ্ড, কাগজ, বোর্ড ও বিভিন্ন জৈবভিত্তিক উপাদানের কাঁচামাল হতে পারে।
নিম্নমানের পাটকেও ফেলনা না ভেবে মূল্য সংযোজিত পণ্যে ব্যবহার করা সম্ভব। পাটের পাতাও খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ পাটকে শুধু আঁশের ফসল হিসেবে না দেখে একটি বহুমুখী কৃষিসম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।এখানে ‘বর্জ্য’ সম্পর্কে আমাদের ধারণাটিও বদলানো জরুরি। আধুনিক শিল্পে একটি পণ্যের অবশিষ্ট অংশকে পরবর্তী পণ্যের কাঁচামালে পরিণত করার প্রবণতা বাড়ছে। পাটের ক্ষেত্রেও এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে একটি পাটগাছ থেকেই একাধিক শিল্প ও মূল্যশৃঙ্খল তৈরি করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে প্রয়োজন- উন্নত নকশা, মান, স্থায়িত্ব, পরীক্ষণ, পরিবেশগত সনদ এবং শক্তিশালী বিপণন। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। গবেষণার ফল যেন গবেষণাপত্রে আটকে না থাকে; তা পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে বাণিজ্যিক পণ্য এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে কৃষককে দিতে হবে উন্নত জাত, মানসম্মত পাট, উন্নত পচনপ্রক্রিয়া ও ন্যায্য মূল্য।
পাট হতে পারে- পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের বিকল্প, কারিগরি বস্ত্রের কাঁচামাল, নির্মাণ ও অবকাঠামোর উপকরণ, যানবাহনের হালকা যৌগিক উপাদান এবং উচ্চমূল্যের জৈবভিত্তিক শিল্পের ভিত্তি। হয়তো আগামী দিনের সাফল্যের গল্প হবে না বাংলাদেশ কত টন পাট বিদেশে পাঠিয়েছে। গল্পটি হবে একটি পাটগাছ থেকে বাংলাদেশ কতগুলো নতুন শিল্পের জন্ম দিতে পেরেছে। তখন ‘পাটগাছের কিছুই কি ফেলনা? এই প্রশ্নটি আর প্রশ্ন থাকবে না। পাটের ভবিষ্যৎ তাই পাটের পরিমাণে নয় পাটের প্রতিটি অংশের সর্বোচ্চ ব্যবহারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
