লালসালুর মজিদ : উপন্যাস থেকে বাস্তবতা
হুমায়রাত হক প্রমি
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচিত ‘লালসালু’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মজিদ। ধর্মকে পুঁজি করে মানুষের সরলতা ও অন্ধবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে সে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। সমাজের মানুষ ধর্মভীরু হওয়ায় মজিদের কথাকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেয়, এমনকি তার অন্যায় ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস দেখায় না। ফলে ধর্মের আড়ালে মজিদের প্রতারণা ক্রমেই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো-মজিদ কি কেবল উপন্যাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ, নাকি বাস্তব জীবনেও তার অস্তিত্ব রয়েছে? উত্তর-অবশ্যই রয়েছে। আমাদের চারপাশেও এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকেন। আর মানুষের সেই বিশ্বাস, ভয় ও সরলতাকেই পুঁজি করে মজিদের মতো কিছু মানুষ ধর্মকে পরিণত করে ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ারে।
ধর্ম মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সংযমের শিক্ষা দেয়। অথচ যখন ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে কেউ নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে তখন ধর্মের মূল উদ্দেশ্যই বিকৃত হয়ে যায়। মানুষ তখন ব্যক্তির চরিত্র বা কাজকে বিচার না করে তার বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। আর এই সুযোগটিই নেয় ধর্মব্যবসায়ীরা।
মজিদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের ভয়। অজানা ও অলৌকিকতার প্রতি মানুষের যে স্বাভাবিক আকর্ষণ ও ভয়, সে সেটাকেই কাজে লাগিয়েছিল। বাস্তব জীবনেও একই কৌশল দেখা যায়। কেউ ধর্মীয় জ্ঞান বা পরিচয়কে ব্যবহার করে মানুষের ওপর অযৌক্তিক প্রভাব বিস্তার করে, কেউ আবার নিজের কথাকে প্রশ্নাতীত করে তুলতে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। মানুষ যখন প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, তখন প্রতারণার পথটিও সহজ হয়ে যায়।
আর এ প্রশ্নহীনতার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায় যখন ধর্মীয় বা সামাজিক প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তির হাতে শিশু কিংবা দুর্বল মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়। সাম্প্রতিক সময়ে নেত্রকোণার ১১ বছরের একটি মাদ্রসার শিশু, তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক দ্বারা ধর্ষিত হয়। শুরুতে শিক্ষক এই দায় এড়িয়ে গেলেও পরবর্তীতে তা প্রমাণিত হয়। এছাড়াও, নুসরাত হত্যাসহ আরও অনেক ঘটনা প্রতিদিন-ই আমাদের চারপাশে ঘটে। শিশুকে ধর্ষণের মতো অভিযোগ আমাদের আবারও ভাবতে বাধ্য করেছে-কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় কি তাকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে? অবশ্যই পারে না।
একজন মানুষ ধর্মীয় পোশাক পরতে পারেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন কিংবা সমাজে ধর্মীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হতে পারেন-কিন্তু এসবের কোনোটিই তাকে অপরাধমুক্তির সনদ দেয় না। বরং ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ সংঘটিত হলে সেটি আরও ভয়াবহ, কারণ সেখানে মানুষের বিশ্বাস ও আস্থারও অপব্যবহার ঘটে।
শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর। একটি শিশু সাধারণত বড়দের ওপর বিশ্বাস করে, বিশেষ করে যাদের সমাজ সম্মান ও ধর্মীয় মর্যাদার চোখে দেখে। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যদি কোনো ব্যক্তি শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা চালায়, তাহলে সে শুধু একজন শিশুর ক্ষতি করে না। সে সমাজের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তিকেও আঘাত করে।
তবে এখানে ধর্মকে নয়, ধর্মের অপব্যবহারকে প্রশ্ন করা জরুরি। ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। কিন্তু কোনো ধর্মীয় পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারে না। একজন অপরাধী তার পরিচয় দিয়ে অপরাধকে বৈধতা দিতে পারে না, আর সমাজেরও উচিত নয় তাকে সেই সুযোগ দেওয়া।
আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ত শুধু মজিদদের অস্তিত্ব নয় বরং তাদের সামনে আমাদের নীরবতা। যখন কেউ প্রশ্নহীনভাবে কোনো ব্যক্তিকে অনুসরণ করে, যখন তার অন্যায়কে ‘ধর্মীয় বিষয়’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, যখন ভুক্তভোগীর বক্তব্যের চেয়ে অভিযুক্তের সামাজিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়-তখন মজিদদের শক্তি আরও বাড়ে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ‘লালসালু’ তে দেখিয়েছেন, অন্ধবিশ্বাস কীভাবে একজন মানুষকে ক্ষমতাবান করে তুলতে পারে। আজকের বাস্তবতাও আমাদের একই শিক্ষা দেয়-বিশ্বাসের সঙ্গে বিবেক ও প্রশ্ন করার ক্ষমতাও প্রয়োজন। ধর্মীয় অনুভূতি থাকা আর অন্ধভাবে কাউকে বিশ্বাস করা এক বিষয় নয়।
আমাদের সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো ব্যক্তির পোশাক, পদবি কিংবা ধর্মীয় পরিচয় নয়-তার কাজ ও চরিত্রই হবে তার মূল্যায়নের ভিত্তি। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো পরিচয়, প্রভাব বা সামাজিক মর্যাদাকে ছাড় দেওয়া যাবে না। অভিযোগ উঠলে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনি ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কারণ মজিদ কেবল একটি চরিত্রের নাম নয়- মজিদ একটি মানসিকতার নাম। সেই মানসিকতা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায় এবং পরিচয়ের আড়ালে অন্যায়কে মেনে নেয়।
লালসালু তাই শুধু একটি উপন্যাস নয়, এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তাও। উপন্যাসের মজিদকে আমরা হয়ত চিনি কিন্তু বাস্তবের মজিদদের চিনতে হলে আমাদের চোখের পাশাপাশি বিবেকও খোলা রাখতে হবে। মজিদ উপন্যাসের পাতায় জন্ম নিয়েছিল কিন্তু তাকে বাস্তবে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব যেন আমাদের না হয়।
লেথক : শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
